মেইন ম্যেনু

লাশের সাগর ভূমধ্যসাগর

ভূমধ্যসাগরের অধিপতি জিউসের ভাই পোসাইডনের রুদ্ররোষে পরে অনেক নাবিককে ডুবে মরতে হয়েছিল। গ্রিক বীর ওদিসিউসকেও অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা সইতে হয়েছিল। ট্রয়ের বীর এনিসকেও কম ঝক্কি মোকাবেলা করতে হয়নি। তারা হারিয়েছিলেন তাদের অসংখ্য সঙ্গীকে। এসবই ঘটেছে অলিম্পাসের দেব-দেবীদের প্রতিহিংসার কারণে। এখন পুরাণের যুগ নেই, অলিম্পাসে বসে দেব-দেবীরাও আর কলকাঠি নারছেন না। তবুও ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। ডুবে মরছে শত শত মানুষ।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এ বছরেই কমপক্ষে দুই হাজার অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পারি দিতে গিয়ে মারা গেছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৭৯ জন। তাদের অধিকাংশই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অধিবাসী। গৃহযুদ্ধসহ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক মানুষ ভূমধ্যসাগর পারি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় ‘পোসাইডনের’ রোষের শিকার হচ্ছেন।

আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোও বেকায়দায় রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশগুলোকে। এ নিয়ে মেসেডনিয়ায় দাঙ্গার মতো ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। অভিবাসী সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। কিন্তু কোনোভাবে ইউরোপের দিকে অভিবাসী ¯্রােত থামানো যাচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ এখন সবচেয়ে বড় অভিবাসী বা শরণার্থী সমস্যায় আক্রান্ত। বৃহস্পতিবার অস্ট্রিয়াতে একটি কাভার্ডভ্যানে আটকা পড়া ৫০ শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে বলে দেশটির স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলসহ ইউরোপের নেতারা যখন অভিবাসী সংকট নিয়ে আলোচনায় বসছেন, সে মুহূর্তেই ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল।

গত মঙ্গলবারও ভূমধ্যসাগরের লিবীয় উপকূলে একটি নৌকা থেকে ৫০ অভিবাসীর লাশ উদ্ধার করেছে সুইডিশ একটি উদ্ধারকারী দল। নৌকার ইঞ্জিল থেকে উত্থিত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে তারা মারা গেছে বলে জানিয়েছে ওই উদ্ধারকারী দলটি। লোকজনকে ডেকের ভিতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়ার কারণে তারা আর বের হতে পারেননি। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে দম বন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়।

গত ১৬ এপ্রিল লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে ৪১ জনের সলিল সমাধি ঘটে। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার প্রাক্কালে পাচারকারীরা ১২ জনকে সমুদ্রে ফেলে দেয় বলে জীবিত উদ্ধার একজন জানিয়েছেন। ওই ১২ জনের সবাই ছিল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের। পরে ওই নৌকার ১৫ পাচারকারীকে আটক করা হয়। ১৯ এপ্রিল লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির যুয়ারাহ শহর থেকে ইটালির উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে লিবীয় উপকূল থেকে ১৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ ইটালির লামপেদুসার কাছাকাছি নৌকা ডুবে ৮৫০ জন অভিবাসী মারা যান। এটা এ যাবৎকালের নৌকা ডুবে সবচেয়ে বড় মৃত্যুর ঘটনা। ওই নৌকা থেকে মাত্র ২৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ইটালির কোস্টগার্ডের জাহাজ ওই নৌকাটি আটক করতে গেলে নৌকায় থাকা লোকজন ভয়ে এক পাশে সড়ে যায়। এতে কাত হয়ে নৌকাটি ডুবে যায়। নৌকার ভেতরে অনেক লোক আটকে থাকায় তাদের আর জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। জীবিত উদ্ধার এক বাংলাদেশির বরাত দিয়ে ইটালির এক সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, নৌকাটিতে ৯৫০ জন মানুষ ছিল। পাচারকারীরা অধিকাংশ অভিবাসীকে জোর করে ডেকের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়। নৌকাটির মধ্যে ৩৫০ জন ইরিত্রিয়ার, দুইশ জন সেনেগালের এবং বাকিরা সিরিয়া, সোমালিয়া, সিয়েরালিয়েন, মালি, গাম্বিয়া, আইভরি কোস্ট ও ইথিওপিয়ার নাগরিক।

২০ এপ্রিল রোডস আইল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে একটি প্রবাল প্রাচীরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে অভিবাসীদের বহন করা একটি নৌকাটি ডুবে গেলে অনেক নিখোঁজ হয়। সেখান থেকে তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ থাকে আরো অসংখ্য। ৯৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে ইটালির কোস্টগার্ড। তবে পরের দিন কোস্টগার্ড জানায়, ৪৫০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, এরা সবাই মারা গেছে।

মে মাসের ৫ তারিখে সিসিলি ও কালাব্রিয়া উপকূলে তিন জনের মৃত্যু ঘটে। নিখোঁজ থাকে আরো অসংখ্য অভিবাসী। কালাব্রিয়া থেকে তিনশ জনকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ফিনিক্স নামে নৌকা থেকে ৩৫৯ জনকে পোজ্জালা দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য কয়েকটি নৌকা থেকে ৬৭৫ জন অগাস্টায় অবতরণ করেন। এছাড়া ২৫০ জনকে সিসিলি চ্যানেলের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ থাকে আরো অনেকে। তবে কী কারণে তাদের খোঁজ মেলেনি, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ২৯ মে ইটালির নৌবাহিনী ২১৭ অভিবাসীকে উদ্ধার করে। ১৭ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ২৩ জুলাই জার্মান যুদ্ধজাহাজ লিবিয়া উপকূল থেকে সামান্য দূরে একটি নৌকা থেকে ২৮৩ জনকে উদ্ধার করে অগাস্টা দ্বীপে নিয়ে আসে। তবে ৪০ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি।

১৫ আগস্ট লিবিয়া উপকূলে একটি পাচারকারীরা অবৈধ অভিবাসীদের একটি ডেকে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিলে ইঞ্জিলের ধোঁয়ায় ৪৯ জনের মৃত্যু হয়। ওই নৌকায় থাকা অন্য অভিবাসীদের ইটালির একটি নৌবাহিনীর জাহাজ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় নৌকাটির ক্যাপটেন ও এক নাবিককে আটক করা হয়। ৬ আগস্ট গ্রিক দ্বীপে যাওয়ার সময় তুরস্কের উপকূলীয় এলাকায় ৬ অভিবাসী ডুবে মারা যান।

গত ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার অভিবাসীদের একটি নৌকা লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে নৌকাটিতে থাকা ৫০ জনের মৃত্যু হয়। একটি সুইডিশ উদ্ধারকারী দল সেখান থেকে আরো ৪০০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা ও উইকিপিডিয়া।






মন্তব্য চালু নেই