মেইন ম্যেনু

লিবিয়ায় যে হালে রয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা

উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া। ২০১১ সালে দেশটির লৌহশাসক হিসেবে পরিচিত কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর দেশটিকে বিরাজ করছে ভয়াবহ অরাজকতা। উন্নত জীবিকার সন্ধানে দেশটিতে পাড়ি দিয়েছিলেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। লিবিয়ায় যারা বাস করছেন, তাদের সামনে এখন ঘোর অনিশ্চয়তা। প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে কাটছে তাদের। এ পরিস্থিতিতেও সেখানে বাস করছেন ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী। কি হালে রয়েছেন তারা? এতো অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা কিভাবে টাকা পাঠাচ্ছেন দেশের বাড়িতে পরিবারের প্রিয়জনদের কাছে? প্রতিবেদন: দ্য ডেইলি স্টার।

ক্ষত-বিক্ষত লিবিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা চরম অনিশ্চয়তা ও অব্যাহত সহিংসতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জীবনের শঙ্কায় থাকা বহু বাংলাদেশী দেশে ফিরছেন। এরই মধ্যে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন বোটে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথ। এখনও যারা লিবিয়ায় অবস্থান করছে, তারা প্রায়ই ডাকাতি বা কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। তিল তিল করে জমানো টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন তারা।

এমনকি লিবিয়ার বেসামরিক মানুষও ভয়াবহ এ অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন। ২০১১ সালে লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর চরম অস্থিতিশীলতা ও তীব্র অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয় লিবিয়া। ১ বছর আগে দেশটিতে মানি ট্রান্সফার এজেন্সিসমূহ তাদের সেবা বন্ধ করে দেয়ার পর প্রবাসীরা গভীরতর সঙ্কটের মুখে পড়েন। ফলে, বৈধ ও বিশ্বস্ত কোন মাধ্যমে নিজ দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোর কোন পথ খোলা নেই অভিবাসী শ্রমিকদের সামনে।

গত ২৪শে আগস্ট প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার বিষয়টি সামনে আসে যখন প্রায় ৫০০ অভিবাসীবোঝাই একটি বোট ভূমধ্যসাগরে ডুবে যায়। সেই বোটে কমপক্ষে ৭৮ বাংলাদেশী ছিলেন। এর মধ্যে ২৪ জন প্রাণ হারান। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৫৪ জনকে। উদ্ধারপ্রাপ্ত বাংলাদেশীরা লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে বলেছেন, লিবিয়ার নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা তাদের এ ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে। গাদ্দাফির পতনের পর কেন্দ্রীয় কোন সরকারব্যবস্থা না থাকায় তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলকেন্দ্রিক ও জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীসমূহ বিভিন্ন অংশের অধিকতর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

এমতাবস্থায়, এ বছরের মে মাসে লিবিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে। এর ১ মাস পর লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস তিউনিশিয়ায় স্থানান্তর করে। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার বাংলাদেশীকে দেশে ফেরত পাঠানো হলেও, এখনও দেশটিতে প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন এবং তারা ভালো নেই।

ত্রিপোলিতে ৬ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলছিলেন, রাস্তায় বেরোনো বেশ কঠিন। কেউ জানেন না কখন তিনি হামলা বা ডাকাতির শিকার হবেন। ১ মাস আগে তিনি ও তার ৬ সহকর্মী কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় একটি সশস্ত্র একটি দল তাদের ওপর হামলা চালায় ও তাদের কাছে কাছে থাকা কয়েক হাজার লিবীয় দিনার ও ৬টি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। জাহাঙ্গীর বলছিলেন, গত বছর আমাদের দেশের বাড়িতে পরিবারের কাছে পাঠানোর জন্য আমরা যা অর্থ জমিয়েছিলাম, তা বাড়ি থেকে চুরি হয়ে গেছে।

এখানে অভিযোগ জানানোর জন্য কোন কর্তৃপক্ষ নেই। এখানেই শেষ নয়। টেলিফোনে জাহাঙ্গীর আরও বলছিলেন, এখানে টাকা পাঠানোর কোন সেবা নেই। তাই হুন্ডির মাধ্যমে আমাদের পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে হয়। এতে আমাদের প্রচুর খরচ পড়ে যায়। আমরা যদি ১ লিবীয় দিনার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫৬ টাকা পাঠাই, আমাদের পরিবারের সদস্যরা পান ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। গত বছর ১ লিবীয় মুদ্রার বিপরীতে পাওয়া যেতো ৬৩ থেকে ৬৫ টাকা পর্যন্ত। এ বছর লিবীয় মুদ্রার দরপতনের পর তা দাঁড়িয়েছে ৫৬ টাকায়।

জাহাঙ্গীর এখন ঈদুল আযহার পর দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ মিশনের শ্রম বিষয়ক উপদেষ্টা এএসএম আশরাফুল ইসলাম বলছিলেন, তারা এ পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত। এজন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা এবং সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এদিকে লিবিয়ায় এখন বাংলাদেশী শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা। কারণ, বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।

২০১১ সালের পর থেকে মিশর, চাদ ও ঘানায় ফিরে গেছেন অধিকাংশ অভিবাসী। তিনি জানান, দেশটিতে এখন সর্বনিম্ন মজুরি বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩০ হাজার টাকার সমতুল্য, যা বেশ ভালো দিক। কিন্তু, সেখানে টাকা পাঠানোর ভালো কোন সেবা না থাকায় বহু বাংলাদেশী দেশে ফিরছেন। আশরাফুল জানান, প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ বাংলাদেশী দেশে ফিরছেন। গত ২ বছর এ সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৪০ জন।

এদিকে বাংলাদেশীদের ইউরোপে যাওয়ার প্রসঙ্গে আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তারা জানেন। লিবিয়া থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে প্রত্যাবাসনের কোন পরিকল্পনা করছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ইতিবাচক কোন উত্তর মেলেনি। তিনি বলেন, তবে যারা দেশে ফিরতে আগ্রহী আমরা তাদের বৈধ ও কূটনৈতিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করছি। এদিকে সাবেক এক কূটনীতিক বলছিলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীরা আরও বেশি অসহায় বোধ করছেন। কারণ, লিবিয়া থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস তিউনিশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে।

তিনি বলছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দু’বার ভাবা যেতো। অবশ্য, আশরাফুল ইসলাম বলছেন, দূতাবাস স্থানান্তরিত হলেও, লিবিয়ায় নিম্নপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনও কাজ করছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দূতাবাসের সেবা প্রদানে পালাক্রমে সেখানে অবস্থান করছেন।






মন্তব্য চালু নেই