মেইন ম্যেনু

শিক্ষককে কান ধরে সাজায় বিব্রত শিক্ষামন্ত্রী, তদন্তে কমিটি

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জের ‘পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের’ প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে উঠ-বস ও পিটিয়ে জখম করার ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছে প্রশাসন। এদিকে স্থানীয় সাংসদ সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে এ ঘটনায় বিব্রত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

তিনি বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে তিনি সাংবাদিককের একথা বলেন।

লাঞ্ছিত করার বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে এসেছে কিনা, আর আসলেও সরকারের করণীয় কী- এ প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটা আমি খবর নিয়েছি, এটা খুবই দুঃখজনক। এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। যে কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে থেকে এ ধরনের আচরণ কখনোই কাম্য হতে পারে না। একজনকে শিক্ষককে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করা কিংবা তার প্রতি এই ধরণের আচরণ করা।

শিক্ষা মন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি তিনি কোনো অপরাধ করে থাকেন, কোনো ভুল করে থাকেন, যে কোনো মানুষ যে কোনো ভুল করতে পারে, আমাদের অনেক শিক্ষক করেন, আমরা ব্যবস্থাও নিই। একটা নিয়ম কানুন আছে, রীতি আছে, রেওয়াজ আছে। এটাকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না, এটার জন্য আমরা বিব্রত। আমরা এই বিষয়ে আরো তদন্ত করে যা যা করনীয় তাই করবো।

বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যানদী গ্রামের স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তির অভিযোগ, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ষড়যন্ত্র করে শুক্রবার স্থানীয় মসজিদের মাইকে ধর্মীয় অবমাননার কথা বলে এলাকাবাসীকে জড়ো করা হয়। পরে তাকে পিটিয়ে জখম করে জনতা।

এক পর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে সবার সামনে তিনি কান ধরে উঠবস করার পর জনতা শান্ত হয়। ওই ঘটনা তদন্তে উপজেলা প্রশাসন একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হয়নি।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ‘অনৈতিক অাবদার’ না রাখায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে অভিযোগ করেন শ্যামল কান্তি। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

রোববার বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যাদী গ্রামের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে কথা হয় প্রধান শিক্ষকের মারধরের শিকার দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাতের। রিফতা বলেন, গত ৮ মে টিফিনের পর পঞ্চম পিরিয়ডের ক্লাস চলছিল। এসময় প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ক্লাস নিচ্ছিলেন।

এসময় আমার পেছনে এক ছাত্র হাসাহাসি করায় স্যার আমাকে ডাকলেও আমি শুনিনি। এরপর স্যার এসে আমার কলার চেপে ধরে মারধর করেন। এতে আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়। এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে ক্লাসের সহপাঠীরা তাকে নাকে-মুখে পানি ছিঁটিয়ে সুস্থ করে লাইব্রেরিতে নিয়ে বসায়। রিফাত বলেন, টিফিনের আগে চতুর্থ পিরিয়ডে উত্তম স্যার ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা চিৎকার ও চেঁচামেচি করলে প্রধান শিক্ষক এসে তাদের বকাঝকা দেন এবং ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেন। তারা বিষয়টি শিক্ষক উত্তম কুমার গুহকে এবং পরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে জানায়, বলেন রিফাত। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির কথামতো শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে চলে আসি। কিন্তু বাইরে থেকে এত লোকজন এসে বিদ্যালয়ে এসে প্রধান শিক্ষককে এসে মারধর করবে-এটা ভাবতে পারি নাই।

রিফাতের অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক উত্তম কুমার গুহ বলেন, প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বলেছেন এমন কিছু তিনি শোনেননি। তবে ছাত্ররা তাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ওইদিন ছুটির ঘণ্টা পড়ে যাওয়ায় তিনি চলে যান। এরপর আর কিছু জানেন না।

প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত অভিযোগ করেন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মতিউর রহমান মিজুর নেতৃত্বে ইউএনও অফিসের পিয়ন মিজানুর রহমান ও মোবারক হোসেন এই হামলা চালায় এবং তাকে মারধর করে। আমার বিরুদ্ধে যে ধর্মীয় অনুভুক্তিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনেছে তা তাদের সাজানো নাটক। আমার প্রাণনাশের জন্য হামলা চালানো হয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মতিউর রহমান আমাকে শায়েস্তা করা হবে বলে ঘটনার একদিন আগে হুমকি দিয়েছিলেন। তাকে বলেছি, বিদ্যালয়ে কোনো চুরি বা দুর্নীতি হলে তার দায়-দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের উপর বর্তায়। তাই আমাকে দিয়ে যা খুশি তাই করানো যাবে না।

দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে থাপ্পড় মারার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ওই ছেলেটি আমার ছেলের মতো। ওই ছাত্রকে দিয়ে কমিটির ওই কয়েকজন এই নাটক সাজিয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সঙ্গে বিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি চায় প্রধান শিক্ষক তাদের ছাড় দিক। কিন্তু তিনি ছাড় দিতেন না। এই কারণে তারা তাকে নানা সময় বকাঝকা হুমকি ধামকি ও মারধর করতে গেছে।

তাকে সরিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির এক সদস্যের আত্মীয়কে প্রধান শিক্ষক পদে বসানোর জন্যই এই পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইসলামিক শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সদস্য সৈয়দ বোরহানুল ইসলাম বলেন, ওইদিন বিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেলে তিনি বাড়ি চলে যান। পরদিন স্কুলে এসে জানতে পারেন দশম শ্রেণির ছাত্র রিফাতকে দুষ্টুমির কারণে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত মারধর করেছেন। এই ঘটনায় স্যার (প্রধান শিক্ষক) অনুতপ্ত হয়ে রিফাতের বাড়ি যান এবং তার মায়ের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন।

ধর্মীয় অনুভূতির বিরুদ্ধে কটুক্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী তার কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। এমনকি রিফাতের বাড়ি গেলে তারাও ধর্মীয় অনুভূতিতে কটুক্তির বিষয়ে কোনো অভিযোগ করেনি বলে দাবি করেন বোরহানুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি এই বিদ্যালয়ের শুরু থেকে আছি। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কটূক্তি করার কোনো অভিযোগ কখনও পাইনি এবং শুনিনি।

মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত বায়তুল আতিক জামে মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদ খোলা থাকে। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র মসজিদে ঘোষণা দিয়েছে। মসজিদের মাইকে আমি ঘোষণা করতে শুনেছি, স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করে কথা বলেছেন। আপনারা যে যেখানে আছেন তারা তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে আসুন। আপনারা স্কুলটি রক্ষা করুন।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটির সভা শুরু হলে কমিটির সদস্য মতিউর রহমান মিজুর মাধ্যমে অভিযোগ দেওয়া হয় এক স্কুল ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে। এই অভিযোগের বিষয়ে স্কুল ছাত্র ও তার মাকে ডাকা হয়। এরমধ্যে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ ম্যানেজিং কমিটির সভায় এসে হামলা চালায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এলাকার লোকজন জোরপূর্বক প্রবেশ করে প্রধান শিক্ষককে মারধর করেছেন। পরে আমরা মাইকিংয়ের মাধ্যমে শুনতে পারলাম প্রধান শিক্ষক ধর্মীয় অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছেন। পরে ছাত্রদের কাছেও তা শুনি।

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান তিনি। কল্যাণদী পঞ্চায়েত কমিটির সহ-সভাপতি সামসুল হক বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বা এলাকার কোনো লোকজনের কথা শুনতেন না। নানা অজুহাতে নিয়মিত স্কুলে আসতেন না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা নিতেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগে শুক্রবার যে ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে তা কোনভাবে থামানো যায়নি।

মাইকে ঘোষণার পর উত্তেজিত হাজার হাজার লোক বিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হলে খবর পেয়ে বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, বন্দর থানার ওসি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। কিন্তু তাদের কথায় উত্তেজিত লোকজনকে শান্ত করার যায়নি। পরে বিকাল ৪টার দিকে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ঘটনাস্থলে আসেন। এসময় স্থানীয় লোকজন তার শাস্তি দাবি করলে এমপি সাহেবের উপস্থিতে প্রধান শিক্ষক এলাকাবাসীর কাছে মাফ চান এবং কান ধরে উঠ বস করেন। পরে পুলিশ হেফাজতে প্রধান শিক্ষকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বন্দর থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, শুক্রবার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফোনে জানান- এক ছাত্রের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সালিশ বৈঠকের সময় এলাকার লোকজন অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এরপর আমি এবং থানার ফোর্স ঘটনাস্থলে যাই। এলাকার মসজিদে মাইকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে লোকজন ডাকা হয়েছে। আমি শান্ত করার চেষ্টা করি। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। পরে এমপি সাহেব ঘটনাস্থলে গিয়ে এলাকাবাসীকে শান্ত করেন।

প্রধান শিক্ষককে পুলিশ প্রহরায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বলেন, ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনে প্রধান শিক্ষকে সকাল থেকে বিদ্যালয়ে মারধর করে ও অবরুদ্ধ করে রাখে এলাকার লোকজন। থানার বিপুল সংখ্যক পুলিশ, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজিত লোকজনকে শান্ত করতে ব্যর্থ হন।

পরে বিকেল ৪টার দিকে খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে উত্তেজিত জনরোষ থেকে প্রাণে রক্ষা করে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। এলাকার লোকজনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক স্বেচ্ছায় মাফ চেয়েছেন, কানে ধরেছেন। ওই বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ খ ম নুরুল আলম বলেন, ঘটনাটি তদন্তে তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা তদন্তে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছি।






মন্তব্য চালু নেই