মেইন ম্যেনু

শিক্ষকদের সম্মান ও অষ্টম বেতন কাঠামো

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বর্তমান সরকারের অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর বিকল্প নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সুফল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন। তবে অষ্টম কমিশন ও সচিব কমিটির কিছু সুপারিশ বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, শিক্ষকদের প্রতিশ্রুত আলাদা বেতন কাঠামো ‘খোঁড়া যুক্তি’তে বাস্তবায়ন না করা এবং নতুন একটি বৈষম্য তৈরি করে শিক্ষক সমাজকে হেয় প্রতিপন্নের অভিযোগও তোলা হচ্ছে।

বেসরকারি সংস্থায় চাকরির কথা বাদ দিলাম। কারণ সেখানকার বেতনের হিসাব দেওয়া হলে অনেকের কাছে ‘বেশি’ মনে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও নিজেদের মতো একটি বেতন স্কেল তৈরি করে রেখেছে, যা বাস্তবায়ন হলে পে কমিশনের সুপারিশকে ছাড়িয়ে যাবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন ধাপে বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্নভাবে পেশাগত উন্নয়নের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে এবং অব্যাহত রয়েছে। বিচারকরাও নিজেদের যতটা সম্মানী হলে স্বাচ্ছন্দ্যে বলা যায়, সরকারকে আইনগতভাবে তেমন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন। এগুলো অযৌক্তিক নয়। বরং দুর্নীতিমুক্ত-বৈষম্যহীন দেশ গড়তে এগুলোর বিকল্প নেই। তবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে হঠাৎ আমলাতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের প্রতি নতুন বৈষম্যের সূচনাও মোটেই কাম্য নয়।

মেধাবী আমলারা জাতির জন্য অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেন। এ বিশ্বাস থেকেই তাদের গাড়িসহ বিভিন্ন ভাতা, ড্রাইভার, পিয়ন, রাজপ্রাসাদসম বাসাবাড়ি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয় না। কিন্তু প্রশ্ন আসে, আমলারা কি জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদানের কথা স্বীকার করেন? অন্তত অষ্টম পে কমিশনের ওপর সচিব কমিটির সুপারিশে প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হয়েছে। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের ও ভিসিদের যে স্থানে রাখা হয়েছে আগে থেকেই তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এখন আবার নতুন বিতর্কের সূচনা কমিশনের জন্য মঙ্গল নয়। সারাদেশের শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে খুব স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। সচিব কমিটি আরও একধাপ এগিয়ে নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অন্যদের জন্য বৈষম্যের ব্যবস্থা করেছে। সপ্তম জাতীয় বেতন কাঠামোতে শিক্ষকদের যে অবস্থান ছিল, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় তা দুই ধাপ নামিয়ে আনা হয়েছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভ্যন্তরীণ আয় না বাড়াতে পারলে আলাদা পে স্কেল না দেওয়ার জন্য সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামোর বিপরীতে এমন পদক্ষেপ শিক্ষক সমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে শুধু আর্থিক বিবেচনায় নয়, সামাজিক বিবেচনায়ও বটে। সরকারের পক্ষ থেকে বহুবারই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সব পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেটি যেমন ২০০৯ ও ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার, প্রণীত শিক্ষানীতিতে রয়েছে, তেমনি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়েছে। শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামোর প্রতিশ্রুতি ১৯৮৬ সাল থেকে দেওয়া হলেও অদ্যাবধি সুরাহা হয়নি। আমাদের দেশে শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান ও আর্থিক সুবিধা আমাদের প্রতিবেশী সমপরিমাণ জিডিপির যে কোনো দেশের চেয়েও অনেক কম। এ জন্য অনেকেই ঠাট্টা করে বলেন, ‘মাস যেতে টের পান যিনি, তিনি মাস্টার।’

আমলাতন্ত্রের তৈরি শিক্ষক সমাজের প্রতি এমন বৈষম্য প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির সাংঘর্ষিক; তেমনি সাংঘর্ষিক রূপকল্প ২০২১, সরকারের ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে প্রতিবন্ধক। প্রস্তাবিত বর্তমান বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন না এলে হয়তো আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষক পাওয়াও অসম্ভব হয়ে উঠবে। এ অবস্থার পরিবর্তন না করলে জ্ঞাননির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন হয়তো স্বপ্নই থেকে যাবে। জাতির নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই বোঝা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই কর্মকর্তাদের কাজের জন্য যোগ্য করে তোলেন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক দিক বিবেচনায় এনে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হবে বলে বিশ্বাস করতে চাওয়াটা নিশ্চয়ই বেশি হবে না। দেশকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার শিখরে নিয়ে যেতে হলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। জাতীয় বাজেটে সরকারকে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তা না হলে সরকারকে ভাবতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থীটি কোন পেশায় যোগদানটাকে লাভবান মনে করবেন? কারণ, এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল নিয়ে বের হওয়ার পর কম জায়গাই রয়েছে, যেখানে শিক্ষকতার প্রথম স্তরের (প্রভাষক) সমপরিমাণ বা এর কম বেতন রয়েছে।

অন্যথায় শিক্ষকরা মৌলিক চাহিদা মেটাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন বিভিন্ন রকম কোর্স চালু করার প্রবণতা বাড়বে, তেমনি অন্য স্তরের শিক্ষকরাও নানা বৈধ ও অবৈধ উপায়ে আয় বাড়াতে উদ্যোগী হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও উচ্চ অর্থ ব্যয় করে শিক্ষা গ্রহণ করা শিক্ষার্থীর অভাব হবে না। আবার বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পাশাপাশি ছাত্রদের বেতন, পরীক্ষা ও ভর্তি ফি বেড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সচিবদের বা ধনীদের ছেলেরা খুব কমই পড়ে, সবচেয়ে বেশি পড়ে মধ্যবিত্তের সন্তানরা।

শিক্ষকদের আলাদা স্কেল দেওয়া বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভব যদি নাও হয়, তাহলে অন্তত প্রস্তাবিত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতেই ৮ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা সিনিয়র সচিবের সমতুল্য করা, সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা সিনিয়র সচিবের সমতুল্য করা, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের বেতন কাঠামো ক্রমানুসারে নির্ধারণ, প্রতিবেশী দেশগুলোর আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণা ভাতা, বই ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত, সরকারি কর্মকর্তাদের মতো গাড়ি, আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করা, প্রত্যাশিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত করা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদমর্যাদা মুখ্য সচিব-মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমতুল্য করে সে অনুযায়ী সুবিধাদিও নিশ্চিত করা সময়ের দাবি হিসেবে সামনে এসেছে। পরবর্তীকালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন করা হোক। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষিত জাতি গঠনে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হবে। যাতে আগামী দিনে অন্যান্য পেশার পাশাপাশি শিক্ষকতায়ও মেধাবীদের খুঁজে পাওয়া যায়।


 

মামুন আ. কাইউম, আওয়াল কবীর জয়, রেজুয়ান আহমেদ শুভ্র মশিউর রহমান, ইব্রাহীম মোল্লা, আলমগীর হোসেনমঈনুল হাছান ও জোবায়ের আল মাহমুদ : লেখকবৃন্দ যথাক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক






মন্তব্য চালু নেই