মেইন ম্যেনু

শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে জাফলংয়ের পাথর কোয়ারির শিশুরা

শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত সিলেটের জাফলংয়ে পাথর উত্তোলন ও ভাঙ্গার কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকরা। এখানকার কোনো কোনো শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না। এতে স্কুলগুলোতে ঝরে পড়ার হারও বেশি। চিকিৎসার জন্য কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তারই তাদের একমাত্র ভরসা। সোমবার দৈনিক ইত্তেফাক এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাফলংয়ের পাথর কোয়ারিতে প্রচণ্ড রোদে, ধুলাবালিতে কাজ করছে এসব শিশু। মেশিনের একটানা শব্দ, খাবার পানির সংকট আর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সেখানে নেই। পিয়াইন নদীতে শীতের মধ্যেই ডুবে পাথর তুলতে দেখা যায় শিশুদের। ওই নদীর পানিতেই মল-মূত্র ত্যাগ করে তারা। মাটির নিচে পাথরের স্তর থাকায় সেখানে টিউবওয়েল বসানো যায় না। তাই বিশুদ্ধ পানির সংকটও কাটে না। সরকারিভাবে বসানো কিছু রিংওয়ালের কুয়াই তাদের খাবার পানির মূল উৎস। পাথর ভাঙার কাজে শ্রমিকরা মুখে মাস্ক ব্যবহার করে না। ফলে তারা সর্দি-কাশি, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়।

সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকী পরিচালিত ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাথর কোয়ারিতে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ৮৩ ভাগ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। ৩৩ দশমিক ৩৩ ভাগ অক্ষরজ্ঞানহীন। ১০ দশমিক ৮৪ ভাগ শ্রমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করেছে। কয়েকজন শ্রমিক অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। কিন্তু কোনো শ্রমিক মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত যেতে পারেনি। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, লেখাপড়া না জানায় ওইসব শ্রমিক পাথর কোয়ারি ছাড়া অন্য কোথাও কাজ পায় না। এছাড়া পাথর কোয়ারিই জাফলং এলাকাবাসীর জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উৎস। তাদের স্বাস্থ্য চিত্রে দেখা যায়, পাথর কোয়ারির শ্রমিকদের ২৮ দশমিক ৩৪ ভাগ অসুস্থ হলে কবিরাজি বা ঝাড়ফুক চিকিত্সা নেয়, ৫৭ দশমিক ৫০ ভাগ শ্রমিক স্থানীয় ফার্মেসি বা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সা সেবা নিয়ে থাকে। এর মধ্যে শিশু শ্রমিকদের অবস্থা খুবই করুণ।

উপজেলার হাসপাতালে প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজারের মতো রোগী আসে বলে জানান গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিভিল সার্জন ডা. রেহানউদ্দীন। তিনি বলেন,‘তাদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ ভাগই শ্বাসকষ্টসহ দূষণজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। আর চর্মরোগের হার প্রায় ৯০ ভাগ। আবার এদের অনেকেই শিশু।’ শ্রমিকরা মাথায় ভারি পাথর বহন করায় তাদের ঘাড়ে কোমরে পিঠে ব্যথার সমস্যাও থাকে বলে জানান এই চিকিৎসক।

গোয়াইনঘাটের মামার বাজার এলাকার জাফলং ফার্মেসির মালিক ডা. এম এ হালিম জানান, ফার্মেসিতে গড়ে দৈনিক ৩০ জন রোগী আসে। তাদের মধ্যে ২০ জনই পাথর শ্রমিক। যারা পেটেরপীড়া, ব্যথা, ঠান্ডাজনিত সমস্যার কারণে আসে।

এ প্রসঙ্গে গোয়াইনঘাট উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফ আহমেদ রাসেল (সহকারী ভূমি কমিশনার) বলেন, পুরো এলাকায় পাথর ভাঙ্গার মিল গড়ে উঠেছে। মিলগুলোর চারপাশে দেয়াল দেওয়া সম্ভব না। তাছাড়া বেশিরভাগ শ্রমিকই স্থায়ী বাসিন্দা নয়। তারা বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় এখানে অবস্থান করায় টয়লেটসহ নিরাপদ পানির ব্যাপারে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে শ্রমিকদের জন্য আরও কিছু কূপ খননের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

শীতকালে পাথর উত্তোলনের মৌসুমে অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ফাঁকা থাকে বলে জানায় গোয়াইনঘাট শিক্ষা অফিস। জাফলং এলাকার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী ওই সময় স্কুলে যায় না। দারিদ্র্যতার কারণেই বিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা বাবা-মায়ের সাথে কাজে যায়। তাই তারা স্কুলে যেতে পারে না।

সূত্র: ইত্তেফাক






মন্তব্য চালু নেই