মেইন ম্যেনু

শিল্পীদের আত্মহত্যার তালিকাটা কেবল বেড়েই চলেছে

কথা হচ্ছিলো এক সময়কার আলোচিত একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর সঙ্গে, বেশ মনোকষ্ট নিয়েই তিনি ফোন করেছেন। জানালেন তার জন্য একজন পাত্র খুঁজতে। প্রথমে ভাবলাম নায়িকা হয়তো মজা করছেন। হাসতে হাসতেই নায়িকাকে বললাম, ‘এই বুড়ো বয়সে আপনাকে কে বিয়ে করবে?’ কিন্তু কিছুক্ষন তার সঙ্গে কথা বলে মনে হলো তিনি সিরিয়াস। কারণ তার যুক্তিগুলো এড়ানো যায় না। তিনি একা থাকেন, তার একজন সঙ্গী দরকার, শেষ বয়সে যখন কেউ থাকবে না তখন তো স্বামীর মমতার হাতটা পাশে থাকবে, বিপদে আপদে কাছে পাওয়া যাবে, মানসিক শক্তিটা থাকবে- এসব কারণেই তিনি এ বয়সেও বিয়েটা করতে চান। নিজের জীবনের একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান এই অভিনেত্রী। ঠিক করে রেখেছেন- যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারলে আত্মহত্যা করবেন।

অভিনেত্রীর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই তার নাম এখানে প্রকাশ করা হলো না। তবে এতো গেলো একজন অভিনেত্রীর কথা। কিন্তু এমন অসংখ্য অভিনেত্রী আছেন যারা মনোকষ্টে নীল হয়ে আছেন ভেতরে, আর বাইরে রঙিন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাবলীলভাবে। প্রায় প্রতি বছরই অভিনেত্রী, অভিনেতা, গায়ক, গায়িকার আত্মহত্যার খবর পাই আমরা। কিন্তু কেনো এই আত্মহত্যা? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই চলুন জেনে নেই বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনের আত্মহত্যার একটি পরিসংখ্যান।

মনে আছে অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের কথা? তার পিতা একজন চিকিৎসক, মাতা বিখ্যাত নারী নেত্রী ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম। চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন এর সাথে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ চলচ্চিত্র তৈরির সময় ডলি ইব্রাহিমের পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তারা বিয়ে করেন। পরিবার, সম্পদ, যশ, খ্যাতির কমতি ছিলনা, তবুও ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে ডলি আনোয়ার বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পর নানা রকম গুজব শোনা যায়। বলা হয়, ডলি আনোয়ারের স্বামী আনোয়ার হোসেন তাকে তালাকনামা প্রেরণ করেন যা সহ্য করতে না পেরে ডলি আনোয়ার বিষপান করেন। এই গুজবের কোন সত্যতা প্রমাণিত হয় নি, ফলে আরও অনেকের মতই ডলি আনোয়ারের এই মৃত্যু রহস্যই থেকে যায়।

সালমান শাহ। জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অকালে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। অভিযোগ উঠে যে, তাকে হত্যা করা হয়; কিন্তু তার সিলিং ফ্যানে ফাঁসিতে হত্যাকাণ্ডের কোনো আইনী সুরাহা শেষ পর্যন্ত হয়নি। তুমুল জনপ্রিয়তায় থাকা একজন অভিনেতা কেনো এভাবে হুট করে আত্মহত্যা করলেন সে প্রশ্নের এখনো কোনো সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি।

মিষ্টি মেয়ে মিতা নূরের কথা নিশ্চই মনে আছে সবার। এক সকালে খবর পাওয়া গেলো এই অভিনেত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে নিজ ফ্ল্যাটেই আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক কলহের কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেন বলে খবর রটে সে সময়। তবে অনেকেই ধারণা করেন, ক্যারিয়ারের প্রতি হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।

প্রেমিক চলচ্চিত্র নায়ক অনন্ত জলিল, বয়ফ্রেন্ড শাকিব ও নিজ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে লাক্স তারকা সুমাইয়া আজগর রাহা আত্মহত্যা করেছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল মিডিয়াপাড়ায়। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া নায়ক অনন্তর ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন রাহা। তখন থেকেই অনন্তর সঙ্গে রাহার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ছবিরই নায়িকা বর্ষাকে ২০১১ সালে বিয়ে করেন অনন্ত। এতে রাহার সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা ভাটা পড়ে। পাশাপাশি মিডিয়ারই এক ছেলের সঙ্গেও রাহা প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। স্বামীর প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি বর্ষা জানার পর তাদের দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। রাহার ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, রাহার পরিবার ধর্মভীরু। তার বাবা-মা ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। কিন্তু রাহা ছিলেন ঠিক এর উল্টো। তার উগ্র চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডে কখনোই সায় দেননি তারা। বরং এ বিষয়ে মেয়েকে অনেকবারই সাবধান হতে বলেন। মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু কোনো কিছুই রাহাকে দমাতে পারেনি। নিজ ফ্ল্যাটে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন রাহা। কিন্তু এখনো এই আত্মহত্যার কেনো কারণ পাওয়া যায়নি।

মূলত অভিনেত্রীই হতে চেয়েছিলেন নায়লা। সেই লক্ষ্য নিয়েই মিডিয়ায় তার পথচলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নায়লা তখনো জানেনি এই রঙিন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুব একটা সহজ না। শিল্প আর শিল্পীর মূল্যায়ন খুব কমই হয় এখানে। তারপরেও চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন নবাগতা নায়লা। লোকনাট্য দল বনানীর একজন সদস্য ছিলেন তিনি। মঞ্চে কাজ করে নিজের অভিনয়ের দক্ষতাও বাড়াতে থাকেন। ‘ললিতা’, ‘পা রেখেছি যৌবনে’, ‘অ-এর গল্প’ ও ‘মুম্বাসা’সহ বেশ কিছু টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই হতাশায় পেয়ে বসে তাকে। সম্প্রতি তার মা মারা যাবার পর তিনি আরো বেশি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি তার ফেসবুকে হতাশামূলক স্ট্যাটাস দিতেন বলে জানান তার সহকর্মীরা। কি কারণে তার এই হতাশা, সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই এ বছরের ২০ মার্চ তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। শ্যামলীর বাসা থেকে নায়লার সিলিং ফেনে ঝুলানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবারে তাকে দাফন করা হয় মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী, থিয়েটার-কর্মী, মডেল ও অভিনেতা মঈনুল হক অলি তার বাসায় আত্মহত্যা করেছিলেন। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পারিবারিকভাবে অলি বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে তার দাম্পত্য জীবন ভালো যাচ্ছিলো না বলে অলির ঘনিষ্ঠজনরা জানান। আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও হতাশ ভুগছিলেন এ অভিনেতা। এসব কারণেই অলি আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে করেন অনেকেই।

এছাড়াও এ বছরই আত্মহত্যা করেছেন চলচ্চিত্রের কসটিউম ডিজাইনার সুমি। তিনি ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘গেরিলা’ ছবিগুলোর কসটিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। নাট্যদল প্রাচ্যনাটের সদস্য ও অভিনেতা রিঙ্কন সিকদারও আত্মহত্যা করেছিলেন কোনো এক অজানা কারণে।

আত্মহত্যার তালিকায় সর্বশেষ যে নামটি যুক্ত হয়েছে সে নামটি পিয়াস রেজার। তিনি রাজধানীর ভাষানটেকে ঈদের দিন ফ্যানের সঙ্গে প্রেমিকার ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। তার পুরো নাম নাঈম ইবনে রেজা ওরফে পিয়াস (২১)। জানা গেছে, গত রোজার ঈদের দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজ ঘরে আত্মহত্যা করেন পিয়াস। ‘একমুঠো সুখ’ ‘অবশেষে’ ‘সাদাকালো মন’- এর মতো বেশকিছু জনপ্রিয় গান রয়েছে পিয়াসের। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ার সময় সহপাঠীর সঙ্গে পিয়াসের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে কয়েক দিন আগে ওই মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি ঘটে। ওই মেয়ের একটি ওড়না পিয়াসের কাছে ছিল। সেই ওড়না দিয়েই পিয়াস আত্মহত্যা করেছেন।

এতো গেল যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের গল্প। আত্মহত্যা করতে গিয়ে বিফল হয়ে ফিরে এসেছেন এমন তারকাও রয়েছে আমাদের মিডিয়ায়। যার মধ্যে প্রথমেই চলে আসবে অভিনেত্রী জাকিয়া বারি মমর কথা। তিনি তার প্রেমিকের প্রতি অভিমান করেই ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। একই ঘটনা ঘটেছে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ন্যান্সির ক্ষেত্রে। তিনিও মৃত্যুর বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। তিনিও ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন।

আবার ফিরে আসি সেই প্রথম কথায়। কিন্তু কেনো এই আত্মহত্যা? কেনো অকালে ঝরে যাচ্ছে এসব প্রতিভাময় প্রাণ? বিভিন্ন জনের কাছে একই প্রশ্ন করে এক বাক্যের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। তবে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে, আত্মহত্যা হচ্ছে একজন নর কিংবা নারী কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যিনি নিজেই নিজের জীবন প্রাণ বিনাশ করেন, তিনি – আত্মঘাতক, আত্মঘাতী বা আত্মঘাতিকা, আত্মঘাতিনীরূপে সমাজে পরিচিত হন।

সূত্রমতে আরো জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায় যে, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয়। এছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য বিষয়াদিও আন্তঃসম্পৃক্ত। তারমধ্যে – নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, আত্মহত্যায় পারিবারিক ঐতিহ্য অথবা পূর্বকার মাথায় আঘাত অন্যতম প্রধান উপাদান।

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দারিদ্র, গৃহহীনতা এবং বৈষম্যতাজনিত উপাদানগুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে। দারিদ্র সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু, তা বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগজনিত কারণে আত্মহত্যার উচ্চস্তরে ব্যক্তি অবস্থান করে। শৈশবকালীন শারীরিক ইতিহাস কিংবা যৌন অত্যাচার অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সময় অতিবাহিতজনিত কারণও ঝুঁকিগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত। প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি না দেওয়ায় প্রেমিক যুগলের সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে অন্যসব পেশার মানুষ থেকে শিল্পীদের আত্মহত্যার তালিকাটা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। এই আত্মহত্যার তালিকা ছোট হয়ে আসুক। আর না বাড়ুক আত্মহত্যার ক্রমিক সংখ্যা এমনটাই প্রত্যাশা করেন শোবিজ অঙ্গণের সকলে।






মন্তব্য চালু নেই