মেইন ম্যেনু

শিশুদের কেন বাড়তি বই পড়ানো হচ্ছে?

আলী নওশের : শিক্ষার্থীদের বয়স ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করে থাকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) । কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বোর্ডের তালিকার বাইরেও শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি বইয়ের বোঝা। বিশেষত কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ওপর অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দিচ্ছে বেসরকারি নামিদামী স্কুলগুলো।

আর এই অতিরিক্ত বইয়ের কারণে শিশুদের পড়ার চাপ বেড়ে যাচ্ছে অনেক। অতিরিক্ত পড়া একটি শিশুর জীবন নিরানন্দ করে দিচ্ছে। অবস্থা এমন যে মাত্রাতিরিক্ত পড়ার চাপে শিশুরা এখন শুধু পড়ার সময় নয়, খেলার সময়ও পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিটি শ্রেণির জন্য বোর্ড যতগুলো বই অনুমোদন করে, সেসব সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি বই যদি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা হবে বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো। অথচ দেশের ‘নামকরা’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজটিই করছে। বোর্ডের নির্ধারণ করে দেওয়া বই তারা যথেষ্ট মনে করছে না। তারা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শ্রেণির শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে অতিরিক্ত দুই থেকে ছয়টি বই।

দেখা গেছে, বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ, সাধারণ জ্ঞান ও হাতের লেখাসহ বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত বই দিয়ে বড় করা হচ্ছে সিলেবাস। এতে শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা ও গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী বোর্ড যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ণ করছে, তা উপেক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে অভিভাবকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

আমরা অভিভাবকরা বলে থাকি, পড়ার সময় পড়া এবং খেলার সময় খেলা। কিন্তু বর্তমানে শিশুদের ওপর যে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে এখন একটি শিশুকে বলতে গেলে সারাক্ষণই বইয়ের মধ্যেই মুখ গুঁজে থাকতে হয়।

বাড়তি বই মানে বেশি বেশি পড়া এবং বেশি বেশি পরীক্ষা। এতে করে শিশুদের কোমল মনে পরীক্ষাভীতি চেপে বসছে। পড়াশোনার পাশাপাশি পরীক্ষা থাকবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিনে দিনে যেন শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের বছরের প্রায় পুরোটা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে পরীক্ষার পেছনে।

দেখা গেছে, শিক্ষকরা ক্লাসে এতগুলো বইয়ের পড়া ঠিকমতো পাঠদান করতে পারছেন না। ফলে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে ছুটছেন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। কেউবা বাড়িতেই রাখছেন একাধিক গৃহশিক্ষক। শিক্ষার্থীরা নাওয়া-খাওয়ার সময়ও পায় না ঠিকমতো। সঙ্গে মা-বাবা বা অভিভবাকদের অবস্থাও তথৈবচ। স্কুল-কোচিং-মডেল টেস্ট নিয়ে সারাদিন তাদের গলদঘর্ম অবস্থা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, স্কুলগুলো কেন বাড়তি বই পড়তে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছে? স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনগুলো এসবের প্রয়োজন আছে উল্লেখ করে নানা যুক্তি দেখালেও বাস্তবে আমরা দেখছি, বেশিরভাগ স্কুল অতিরিক্ত বইগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কিংবা নির্দিষ্ট প্রকাশনার বই কেনার জন্য বলে অভিভাবকদের। অন্য জায়গা থেকে কিনলে শিক্ষকরা সেটি গ্রহণ করেন না।

এসব বই কিনতে অভিভাবকদের মোটা অংকের টাকা বেরিয়ে যায় পকেট থেকে। এ থেকে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, সিলেবাসে অতিরিক্ত বই রাখার পেছনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য রয়েছে?

তবে কিছু অভিভাবকও আছেন, যারা তাদের ছেলে-মেয়েকে ক্লাসে প্রথম-দ্বিতীয় করার জন্য হন্যে হয়ে ওঠেন। এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে তাদের মধ্যে। অভিভাবকদের মধ্যে অনেকে আছেন, যারা বেশি হোমওয়ার্ক দেওয়া শিক্ষক, সারা বছর পরীক্ষা নেয় এমন স্কুল এবং কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের পছন্দ করেন।

তাদের ধারণা এমন, সারাক্ষণ পড়াশোনা, কোচিং ও পরীক্ষার চাপে থাকলেই তাদের সন্তান পড়ালেখায় এগিয়ে যাবে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাবে। অথচ তারা ভাবেন না, এই বাড়তি চাপ শিশুদের কাছ থেকে তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে, তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

কোমলমতি ছেলেমেয়েরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অবশ্যই বই পড়বে। কিন্তু সেসব বই হবে ছড়া, কবিতা, ছোট ছোট গল্পের বই। যেসব বই পড়ে সে আনন্দ পাবে, পড়ার জন্য উৎসাহিত হবে।

সরকারি স্কুলগুলো যেখানে শুধু পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নির্ধারিত বই পড়াচ্ছে, সেখানে বেসরকারি স্কুল কেন বাড়তি বই যোগ করছে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে সিলেবাস বড় করছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। বন্ধ করা প্রয়োজন শিশুদের ওপর বাড়তি বই বা সিলেবাস বড় করার নিয়ম। শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে আমাদের।






মন্তব্য চালু নেই