মেইন ম্যেনু

শীতে একটু মানবিকতা

ছোট বেলায় পড়েছি বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ এবং এর বায়ু নাতিশীতোষ্ণ। কিন্তু এ সময়ে এসে সবকিছুর সঙ্গে আমাদের প্রকৃতিও যেন পাল্টে গেছে। বাংলাদেশে এখন আর ষড়ঋতু কিংবা নাতিশীতোষ্ণ বায়ু কোনোটিই নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলের আবহাওয়া বদলে গেছে। বিশেষ করে বৈশিক উষ্ণায়নের কুফলগুলো আমাদের ওপরই বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এখানে গ্রীষ্ম যেমন দাবদাহ নিয়ে হাজির হয়, তেমনই শীতও অসহায় মানুষের ওপর খড়গ হয়ে নামে। গত কয়েক বছরের শীত এ দেশের মানুষের জন্য অভিশাপ হয়েই দাঁড়িয়েছে। দেশের ইতিহাসে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে এসেছে। আর শীতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

শীতে মানুষের মৃত্যু হবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। কিংবা বৈরী আবহাওয়া কারও প্রাণ কেড়ে নিবে এমনটা ভাবাও কষ্টকর। তারপরও প্রতি বছর আমরা আমাদের সেই স্বজনদের বাঁচাতে পারি না। এ দায় আমাদের সবার। কারণ শীতে তাদের নিরাপত্তা দিতে আমরা কিংবা রাষ্ট্র এ দায় এড়াতে পারি না। আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি থাকে, এটা সব সময়ই থেকে যায়। আর সে কারণেই এই মানুষজনকে অকালে চলে যেতে হয়। আমাদের দেশের নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুরসহ পুরো উত্তরবঙ্গের দরিদ্র, অসহায় মানুষের জন্য ডিসেম্বর-জানুয়ারি যেন আতঙ্কের নাম। প্রতি বছর এই অঞ্চলে অনেক মানুষ শীতে মারা যায়। যার কিয়দংশও আমরা জানতে পারি না। আসলে এগুলোকে আমরা সাধারণ ও স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই মেনে নেই।

দেশের উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশেই শীত একটি বিভীষিকা। প্রচ- শীতে ঘরেই থাকাটা যখন অনিরাপদ ঠিক তখন লাখ লাখ মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। দেশের প্রধান শহর ঢাকাসহ সব জেলা শহরেই এমন অগণিত উদ্ভাস্তুর দেখা মিলে, যাদের মাথার ওপর কোনো ধরনের ছাউনি থাকে না। এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। তার চেয়ে বড় কথা এই মানুষের জৈবিক চাহিদা, প্রসব কিংবা প্রজননের কাজও সম্পন্ন হয় এই খোলা আকাশের নিচে। অর্থাৎ একটা শিশুর নতুন জন্মই হয় খোলা আকাশের নিচে। আমরা চাইলেই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারব না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা। কিন্তু আমরা সবাই চাইলেই তাদের বিপন্ন হয়ে যাওয়া এক একটি জীবন ঠিকই বাঁচাতে পারি। এর জন্য খুব একটা কষ্ট করতে হবে তা কিন্তু নয়। শুধু একটু আন্তরিকতা প্রয়োজন।

আমাদের দেশের বহু লোক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যাদের কাছে শীতবস্ত্রটা কেনা প্রায় অসাধ্য। কারণ আমরা এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আহার, শিক্ষা, পোশাক, বাসস্থানসহ আরও অন্যান্য মৌলিক অধিকারই নিশ্চিত করতে পারিনি। আর উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য এ বিষয়গুলো কঠিন ব্যাপার বৈকি। তারপরও সরকার বা এদেশের সচ্ছল মানুষের সাহায্য পেলে এমন অনেক মানুষই অন্তত শীত থেকে বেঁচে যেতে পারেন। এসব কাজ করার জন্য শুধু সরকার নয় বরং আমাদের মতো সাধারণ মানুষও অনেক ভূমিকা রাখতে পারে। তা ছাড়া প্রতিবছরই শীতে এমন অনেক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন তাদের হাত প্রসারিত করে বস্ত্রহীন মানুষের পাশে দাঁড়ান।

রাস্তার কাছে, ফুটপাতে জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকা মানুষের দিকে তাকিয়ে অনেকেরই চোখে জল আসে। ইচ্ছে করে তাদের জন্য কিছু একটা করতে। কিন্তু এত এত উদ্বাস্তু আর দরিদ্র মানুষের জন্য একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। এমনটা ভেবেই পিছিয়ে যান সবাই। আসলে এমন গৃহহীন মানুষের সংখ্যা যেমন নিছক কম নয়, তদ্রƒপ খুব বেশিও নয়। একজন মানুষকে সারা দেশ নিয়ে ভাবতে হবে না, বরং সে তার কাছের মানুষকে নিয়ে ভাবলেই হবে। তার বাড়ির কাছের যে মানুষটির শীতের একটি পোশাক নেই সে তাকে পুরনো অথবা নতুন সাধ্য অনুসারে সেটা দিলেই তো হয়ে গেল। একটি এলাকায় যত সংখ্যক সচ্ছল লোক বসবাস করে তার একশ ভাগের এক ভাগও অসচ্ছল লোক বসবাস করে না। তার পরও এই অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত শীতে। কারণ তার শীত নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত পোশাক নেই।

আমাদের সমাজের বড় একটা পরিবর্তন হয়েছে। সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজ পড়–য়া ছেলেদের বেশ বড় একটি অংশ এখন এই মানুষের কথা ভাবছে। ভাবছে তাদের কীভাবে শীতের তীব্রতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়। বাংলাদেশের কম বেশি সবকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা হয়। এতে সবাই নিজের পুরনো কিংবা নতুন একটি দুটি শীতবস্ত্র দিয়ে এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করতে পারে। আর এর ফলে আমাদের দেশের বিশাল একটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে এই শিক্ষার্থীরা শীতবস্ত্র তুলে দিতে পারছেন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো করে কলেজ, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরেও এই কাজগুলো চালু হতে পারে। যদি একটি ছোট শিশু তার অতিরিক্ত শীতবস্ত্রটি অন্য একটি শিশুকে পরিধানের জন্য দান করে তবে সেই শিশুটিও তার স্কুলে মানব সেবার এই মানবিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করল। আর সেটিই হবে আমাদের সমাজের সর্বোচ্চ শিক্ষা।

আমাদের সবার অনেক কিছু করার সামর্থ্য হয়ত নেই। তবে সাধ্যের মধ্যে অল্প কিছু করার সামর্থ্য নিশ্চয়ই আছে। একজন শিক্ষক তার স্কুলের নয়, শুধু শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব তো নিতে পারেন, বাড়িওয়ালা কিংবা ভাড়াটে তার ফ্ল্যাটের দায়িত্ব, সংগঠক তার সংগঠনের, কøাস ক্যাপ্টেন তার ক্লাসের, সম্পাদক তার পত্রিকার, পরিবারপ্রধান তার পরিবারের, আড্ডার কোনো একজন, পাড়া বা মহল্লার তরুণরা এভাবেই সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বদলে দিতে পারি আমাদের চার পাশটা। তীব্র শীতকে তুড়ি দিয়েই সমাধা করতে পারি আমার সবাই। আমাদের একটু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে গড়ে তুলতে সুন্দর একটি বাংলাদেশ।

তীব্র শীতে উত্তরাঞ্চল কেন বাংলাদেশের আর একটি মানুষেরও যেন আর মৃত্যু না হয় এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। তাই শীত মোকাবেলার মানবিক যুদ্ধটা শুরু হোক নিজ থেকে। শুধু ভাবুন আপনি শুরু করলে শুরু করবে সবাই। তাই বদলে দেওয়ার এই অঙ্গীকারটুকুর পথ প্রদর্শক হোন এখনই। আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।






মন্তব্য চালু নেই