মেইন ম্যেনু

শেষ বিদায়ের কারিগর মনু মিয়ার গল্প

মানুষের অবয়ব। একজনের সঙ্গে অন্যজনের মিল থাকে না।। তেমনি মানুষের কাজ ও চিন্তা-ভাবনার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজে চলার পথে কাজেরও ভিন্নতা রয়েছে। তার পরও আমাদের গতানুগতিক জীবনধারায় কোনো কোনো মানুষ আছেন, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, অথচ সমাজ ও মানুষের জন্য নিবেদিত থেকেছেন আমৃত্যু। চলার পথে যতটুকু অর্জন করেছেন, শিখেছেন তার সবটুকু সমাজ ও মানুষের জন্যই করে যান। মহৎ কাজের জন্য বড় রকমের বিদ্যা, বুদ্ধি, পড়াশোনার প্রয়োজন হয়তো আছে। তার পরও উচ্চশিক্ষা ছাড়াও কোনো কোনো মানুষ সমাজে ব্যক্তিক্রমধর্মী ভালো কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এমনি একজন ভালো কাজের মানুষ হচ্ছেন কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর উপজেলা ইটনায় জম্ম নেওয়া মনু মিয়া।

মনু মিয়াকে বলা হয় অন্তিম শয্যার কারিগর, আবার কেউ কেউ বলেন শেষ বিদায়ের কারিগর। মনের গহিনের পরম দরদ আর অপার ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টিশীল শিল্পির মতো তৈরি করেন কবর। মুসলিম সম্প্রদায়ের শেষ ঠিকানা কবর। জানাজার পর যেখানে ইহজগতে মুসলিম সম্প্রদায়ের লাশের শেষ গন্তব্য হয়ে থাকে। কারও মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই খুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনাসহ কবর খুঁড়তে বা তৈরি করতে সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যান। গ্রাম থেকে গ্রামে, দূর থেকে দূরে কবর খনন করেন মনু মিয়া। মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযাত্রীর মতো তিনি বাড়িয়ে দেন দু’হাত। এভাবেই কবর খননের কাজ করে তিনি পার করে দিয়েছেন তার ৬০ বছরের জীবনের সুদীর্ঘ ৩৭টি বছর। কোনো ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বকশিশ না নিয়ে এ পর্যন্ত খনন করেছেন ২ হাজার ৪০১টি কবর। ব্যতিক্রমী পন্থায় মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতার এক অনন্য প্রতীক মনু মিয়া। মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা মাটিরঘরের নিবেদিত শিল্পী।

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম মনু মিয়ার। বাবা আবদুল হেকিম মিয়া এবং মাতা সারবানুর দুই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে মনু মিয়া তৃতীয়। ছোটবেলায় মনু মিয়া ছিলেন অত্যন্ত ডানপিটে ও দুরন্ত স্বভাবের। সে কারণে বাবা আবদুল হেকিম মিয়া ছেলেকে স্কুলে পাঠালেও লেখাপড়ায় এগোতে পারেননি। বরং স্কুল কামাই করে বন্ধুদের সঙ্গে হাডুডু, ডাংগুলি ও ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকার পাশাপাশি নানা রকম দুষ্টুমিই ছিল তার কাজ। এর পরও ছোট ছেলে হিসেবে বাবা-মায়ের খুব আদরের ছিলেন মনু মিয়া। কৈশোরেই তার আবদার রক্ষা করতে বাবা আবদুল হেকিম মিয়াকে ঘোড়া পর্যন্ত কিনে দিতে হয়েছিল। হাসিখুশি আর হৈহল্লায় মেতে থাকা মনু মিয়ার জীবনে হঠাৎ করেই ঘটে ছন্দপতন।

যেভাবে শুরু : মাত্র ১৮ বছর বয়সে মনু মিয়া তার মাকে হারান। মায়ের কবরে বাবা, বড় ভাই আর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে একমুঠো মাটি দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানোর সময়েও মনু মিয়া বুঝতে পারেননি তাকে কতটা স্নেহবঞ্চিত করে চলে গেছেন মা! খুব অল্পদিনেই যখন মায়ের অভাবটা বুঝতে শুরু করলেন, তখন থেকে মনু মিয়াও শামিল হলেন বদলে যাওয়ার মিছিলে। কারও মৃত্যু সংবাদ শুনলেই তার মানস পর্দায় ভেসে উঠত স্নেহময়ী মায়ের কথা। ভেসে উঠে মায়ের মুখ। অকৃত্রিম ভালোবাসার সেই মা মাটির ঘরের শেষ বিছানায় কেমন কাটছে তার দিন? কেমন আছেন মা? মাকে নিয়ে এসব খুব ভাবাতো মনু মিয়াকে। ব্যাকুল হৃদয়ে মায়ের কবর জিয়ারতের জন্য ছুটে যেতেন কবরস্থানে। কবরস্থানে এভাবে যাওয়া-আসা থেকেই স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে মনু মিয়া একদিন কবর খননের কাজে অংশ নেন। প্রথম দিনের কথা বলতে গিয়ে মনু মিয়া বলেন, আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মায়ের শেষ ঠিকানাটা সাজিয়ে দিচ্ছি। এরপর থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই তাদের সঙ্গে কবর খননের কাজে অংশ নিয়েছি। এভাবে একসময় এ কাজটার প্রতি আমার অন্য রকমের একটি ভালোলাগা জন্মে গেল। কোনো কারণে যদি একটি কবরে শরিক হতে না পারতাম, মনে হতো কী যেন করা হয়নি।

টানা ৩৯ বছর : প্রথমে স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে প্রথম প্রথম আত্মীয়-স্বজনের কবর খননের কাজে অংশ নিতেন। ক্রমেই দক্ষতা অর্জন করে তিনি হয়ে উঠেন করব তৈরির দক্ষ, নিপুণ কারিগর। পরে বড় আদরের এই কাজটিকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে নিবেদিত ও আন্তরিকভাবে কবর খননের কাজ করে যাচ্ছেন। একজন নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায়।

যন্ত্রপাতির বাহার : মনু মিয়ার উপলব্ধি মানুষের অন্তিম শয়নের কবরটি হতে হবে সুন্দর, নিখুঁত ও সৃষ্টিশীল। কারণ মৃত্যুই জীবনের শেষ ঠিকানা। জন্মের একমাত্র শর্ত হলো মৃত্যু। দুনিয়ায় কত ক্ষমতা, ধন ও সম্পদ। অন্তিম শয়নে কিছুই দেওয়া যায় না। একমাত্র কাফনের কাপড় ছাড়া। তাই বিদায়বেলা কোনো অযত্ন নয়। কবর খুঁড়তে এবং সুন্দর করতে যত জিনিসপত্রের দরকার, সবই আছে মনু মিয়ার কাছে। কবর খনন করার জন্য নিজের খরচায় তিনি কোদাল, দা, করাত, রাম দা, হাতুড়ি, ছোট-বড় খুঁন্তিসহ সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে নিয়েছেন।

মনু মিয়ার পদচারণা : ঢাকার বনানী গোরস্তান থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মনু মিয়া কবর খনন করেছেন। বিশেষ করে হাওরের পাঁচটি জেলার ৩৩টি উপজেলার কোনো না কোনো গ্রামে থাকে নিপুণ হাতে কবর তৈরি করতে হয়েছে। কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি কারও মৃত্যু সংবাদ পেয়েছেন, তিনি সেখানেও কবর খননের কাজে লেগে গেছেন। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর কবর করার ইচ্ছা নিয়ে তিনি ঢাকায় যান। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পরও তিনি কবর খননের জন্য ঢাকায় চলে যান। কিন্তু তাকে কেউ চেনে না বলে নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। শুরুতে তার স্ত্রী রহিমা বেগম এ কাজে আপত্তি জানালেও মনু মিয়ার এ কাজের প্রতি আগ্রহ, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দেখে তিনিও এক সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে স্বামীকে উৎসাহিত করেন। রহিমা বেগম জানান, স্বামীকে যতটা সম্ভব মানসিক সমর্থন দিয়ে থাকি। কারণ এই মহৎ কাজটি তার জীবনে ব্রত হয়ে গেছে। নেশার মতো। তাছাড়া এ কাজ করতে গিয়ে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা তিনি পাচ্ছেন, এটাও আমার পরম শান্তি। পরকালে নিশ্চয় সৃষ্টিকর্তা আমার স্বামীকে পুরস্কৃত করবেন আমার বিশ্বাস।

মনু মিয়ার বয়স হলেও শক্তি-সামর্থ্য মানুষ তিনি দ্বিধাহীনভাবে বলেন, শরীরে শক্তি-সামর্থ্য থাকলে আমৃত্যু এ কাজটি চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি সেই দিনটির অপেক্ষায় আছেন যখন তার কবর খনন করার জন্য তারই মতো কেউ নিঃস্বার্থ মন নিয়ে খুঁন্তি-কোদাল হাতে এগিয়ে আসবেন।

মনু মিয়ার জীবনে অনেক বড় এবং ভালো মানুষের কবর তৈরি করেছেন। ইটনা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন ঠাকুর, ইটনার দেওয়ার আবদুর রহিম দেওয়ান গত ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই আবদুর রাজ্জাকের কবরসহ শত শত হাওরের গণ্যমান্য ব্যক্তির কবর করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। কবর দেখে একজন নিপুণ কবর কারিগর বলা যায়।






মন্তব্য চালু নেই