মেইন ম্যেনু

প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ ভারতের কাশ্মির : পর্ব-২

শ্রীনগরের ডাল লেক যেমন বিখ্যাত তেমনি ভেড়া-ছাগলের পালও প্রসিদ্ধ

ভারতের একসময়ের সংঘাতময় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মিরের (জে.কে) শীতকালীন রাজধানী জম্মু থেকে সড়ক পথে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে যাওয়ার পথে মাইলের পর মাইল যানজটের সম্মূখীন হতেই হবে কোন না কোন স্থানে। আর সেটা শতশত ভেড়া বা ছাগলের পালের কারণে।

স্থানীয় রাখালরা মুখে একধরনের শীষ বাজাতে বাজাতে বাজাতে বড় বড় আকৃতির শত শত ভেড়া ও ছাগলের পাল নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য নিশ্চয়ই চোখে পড়তে বাধ্য। রাখালদের অনেকে ঘোড়ায় চড়ে আবার অনেকে পায়ে হেটে পাহাড়ের গায়ে ওই সকল ভেড়া-ছাগলের পাল চড়িয়ে ফেরে। এছাড়াও মহিষ ও গরুর পালও কমবেশি চোখে পড়ে।

ভেড়া-ছাগলের কারণে রীতিমত দূর্গম পাহাড়ি রাস্তায় যানজটে পড়তে বেশ ভালোই লাগে। ভেড়া ও ছাগলের লোম বড় হলে তা কেটে শীতবস্ত্র তৈরীর জন্য বিক্রি করে থাকে রাখালরা। তাছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে ওই সকল ভেড়া ও ছাগল বিক্রিয় হয় মাংস খাওয়ার জন্য। ফলে রাখালরা খুব যত্ন সহকারে তাদের পোষা ভেড়া-ছাগলগুলো লালন-পালন করে লোম ও মাংস বিক্রয়ের অভিপ্রায়ে।

পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যতই পথ পাড়ি দেয়া হয় অর্থ্যাৎ উপড়ে উঠা হয় ততই শীত অনুভূত হয়। শ্রীনগরে পৌছে গাড়ি গুলো মূলত টিআরসি (টুরিস্ট রিসিপশণ সেন্টার) পর্যন্ত যায়। বললে হোটেলেও পৌছে দেয়। দূর্গম হলেও ওই পাহাড়ি রাস্তা বেশ ভালো ও এক নাগারে খাড়া (উচু) কম হওয়ায় বড় বাস, ট্রাকসহ সব ধরণের যানবাহন চলাচল করতে পারে।

খুবই সুন্দর ও সাজানো গোছানো শ্রীনগর শহরে প্রায় সাড়া বছরই শীত অনুভূত হয়। তবে শীত মৌসুমে সেখানে ব্যাপকহারে বরফ পড়ে। বিভিন্ন এলাকা ভেদে রাস্তা ঘাট ৮/১০ ফুট পর্যন্ত বরাফে আছন্ন থাকায় সেনাবাহিনী প্রতিনিয়ত মেশিন দিয়ে রাস্তা থেকে বরফ সরিয়ে চলাচল উপযোগী করে থাকে বলে স্থানীয়রা জানালেন। আর বরফ পড়ার কারণেই শ্রীনগরসহ পাশ্ববর্তী সব এলাকার বাড়ি ঘর যে কয় তলা বিশিষ্ট হোক না কেন টপ ফ্লোর বা চূড়ায় গিয়ে তা অবশ্যই টিন দিয়ে ছাউনির মতো। তবে তাদের বাড়িঘরের শৈল্পিকতা অত্যন্ত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন।

কাশ্মিরী ও উর্দু ভাষাভাষীর জনগণের রাজধানী শ্রীনগরে ৯৫ভাগই মুসলিম। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এ্যারাবিক দেশগুলোর মতোই ওই সকল বাড়ির অভ্যন্তর সাজানো। শীতের কারণে প্রতিটি বাড়ি বা আবাসিক হোটেলের মেঝেতে মোটা কার্পেট অবশ্যই বিছানো থাকে।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ীসহ কয়েক জনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেলো তাদের বসার ঘরের মেঝেতে শুধু দামী কার্পেটের উপর আমাদের দেশের হাফ কোলবালিশের মতো বালিশ দেয়া রয়েছে। সোফা, ডাইনিং নয় বরং রীতিমত কার্পেটের উপর বসেই দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া দাওয়াসহ টিভি দেখা চলে। শুধু শোয়ার ঘরে ‘খাট’ রয়েছে। তাছাড়া বলতে গেলে সকল বাড়িতেই বসতে গেলে সরাসরি কার্পেটেই বসতে হবে। তাছাড়া ওয়াশিং ম্যাশিনের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বাড়ি ও হোটেল গুলোতেও পানি গরম রাখার ম্যাশিন থাকা যেন বাধ্যতামূলক বিষয়।

পাথরের উচু পাহাড়-পর্বত হলেও শ্রীনগর শহরটি পাহাড়ের উপর কিছুটা সমতলে অবস্থিত। পাথরের এমনও অনেক পাহাড় আছে যেখানে গত ৩০/৪০ বছর যাবত পাথর কাটা অব্যাহত থেকেও সামান্য অংশ কাটা সম্ভব হয়েছে।
ওখনে পাথরের দাম খুবই কম। এক ট্রাক বালির দাম যেখানে ৫/৬হাজার টাকা সেখানে ভাঙ্গা পাথরের দাম মাত্র ৩হাজার টাকা।

পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ভেড়া-ছাগলের পাল

পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ভেড়া-ছাগলের পাল

ঐতিহাসিক ‘ডাল লেক’টি প্রবাহিত হয়েছ শহরটির মধ্য দিয়েই। বেশ চওড়া ও ১৮/২০কি.মি ব্যাপী এ ডাল লেকটিকে ঘিরে রয়েছে রকমারী সৌন্দর্যবদ্ধর্নের কারুকার্য। ‘ভাসমান বাড়িঘর’ বা হাউস বোর্ট ‘ডাল লেকে’র অন্যতম ঐতিহ্য। ওই বোর্টে বহু পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করে। তাদের বংশধরের অনেকে বিদেশে অবস্থান করার পরেও পূর্ব পুরুষরা জেলে পরিবার হওয়ায় ঐতিহ্যগত কারণে তারা এখনো হাউস বোর্টে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এরূপ ওই ‘ডাল’ লেকে কাঠের লঞ্চের মতো ভাসমান স্থাপনায় রীতিমতো আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য হস্তশিল্পের দোকান তৈরী হয়েছে টুরিস্টদের আরো আকর্ষিত করার লক্ষ্যে। সড়কের পাশে লেকের নির্দিষ্ট বহু নম্বর সম্বলিত ঘাট থেকে ছোট ছোট নৌকা যোগে ওই সকল হাউস বোট, আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য দোকানে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় ছোট ছোট বাহারী নৌকায় করে ৩’শ/৫’শ রূপি ঘন্টা চুক্তিতে ডাল লেকের কিছু অংশে নৌবিহার করা যায়। ওই ছোট নৌকাগুলোকে স্থানীয়রা ‘শিকারা’ বলে থাকে।

ঐতিহাসিক এ ডাললেকটি গাগরিবাল, লোকুটডাল, বোডডাল ও নাগিন নামের ছোট ছোট দ্বীপগুলোকে বিভক্ত করেছে। লোকুটডাল ও বোডডাল দ্বীপের কেন্দ্রকে রাপ লেংক বা চার চিনারী ও সোনা লেংক বলে থাকে। এই চার চিনারী দ্বীপটি ‘চিনার’ গাছের জন্য বিখ্যাত। ‘চিনার’ নামের ব্যতিক্রমি ওই গাছগুলো শ্রীনগরের শহরের বিভিন্ন রাস্তার পাশের দেখা যায়। এ গাছগুলো মোঘল আমলের সম্রাটরা অন্যত্র থেকে এনে এখানে লাগিয়েছিল যা অন্য কোন জায়াগায় সচারচার দেখা যায় না।

পাশেই রয়েছে নেঘিন লেক। এ লেকটি শ্রীধারা (জাবারওয়ান) পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত। ডাল লেকের একটি অংশ নেঘিন ছোট হলেও খুবই সুন্দর। নেঘিন, ডাল লেকের পানির রং ঘন নীলের মতো।

চলবে… ৬টি পর্ব…

লেখক:
আরিফ মাহমুদ
সম্পাদক
আওয়ার নিউজ বিডি ডটকম

পর্ব-১ : জম্মু থেকে একমাত্র দূর্গম পাহাড়ি পথে রয়েছে আড়াই কি.মি’র জওহার ট্যানেল






মন্তব্য চালু নেই