মেইন ম্যেনু

সংবাদপত্রের সেকাল-একাল

হামিদা আক্তার স্মৃতি : ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে কোনো দৈনিক সংবাদপত্র ছিল না। সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে মূলত কলকাতা থেকে সংবাদপত্র আসত। বলিয়াদি প্রেসের সংবাদপত্র ছিল ‘ইনসাফ’। এরপর ‘জিন্দেগী’ নামে একটি সংবাদপত্র হলো। এটিই পরে ‘সংবাদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে এলো ‘আজাদ’ নামের একটি পত্রিকা। মওলানা আকরম খাঁ এখান থেকে দৈনিকটি বের করা শুরু করলেন। ১৯৫২ সালের আগে ইত্তেফাক পত্রিকাটি সাপ্তাহিক ছিল। সম্ভবত ১৯৫৩ সালের শেষ কিংবা ১৯৫৪ সালের শুরুতে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগে ইত্তেফাককে দৈনিক করা হয়।

১৯৫৫ সালে সংবাদ পত্রে কাজের পরিবেশ একেবারেই ইনফরমাল ছিল। সংবাদপত্রে তখন এখনকার মতো মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবেশ ভালো থাকলেও কাজের পরিবেশ কিন্তু মোটেও সুষ্ঠু ছিল না। রেফারেন্স ও রিসার্চ ছাড়া মডার্ন জার্নালিজম সম্ভব নয়,তখন এটি ছিলই না। বর্তমানে যেমন প্রযুক্তি বহুদূর এগিয়েছে, তখন লজিস্টিক সাপোর্ট বলতে ছিলো টেলিপ্রিন্টার ।

আজকের দিনে ইন্টারনেটের বদৌলতে গুগলে অসংখ্য তথ্য এক নিমেষেই পেয়ে যাচ্ছি। অনেক ডাটাও পাচ্ছি খুব সহজেই। এখন অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, কিন্তু সেগুলো করা না করা তাদের ওপর নির্ভর করে। বিপদও আছে কিন্তু, আগে সিন্ডিকেট বলে একটা কিছু ছিলো। একজন লেখক একটা লেখা লিখে সেটি সিন্ডিকেটে দিতেন। যেমন ওয়াল্টার লিপম্যান ৭০টি কাগজে লিখতেন। এটি সিন্ডিকেটেড কলাম।

বর্তমানে রিপোর্টারদের মধ্যে সিন্ডিকেট রয়েছে। এক জায়গা একজন রিপোর্টার খবর কাভার করলে তাঁর কাছ থেকে কপি নিয়ে সবাই একই খবর কভার করছেন। এই সিন্ডিকেটেই সাংবাদিকতার সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু সেকালে এমনটা হতেই পারত না। বরং আগে এটাই রীতি ছিল যে একজন রিপোর্টার যা রিপোর্ট করেন, সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ওই পত্রিকার সম্পত্তি বলে মনে করতেন। কোনো দিনই তিনি সেটি শেয়ার করতেন না। তাহলে তো তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য চলে যাবে,এই ভেবে যার সংগ্রহকৃত রিপোর্ট শুধু মাত্র সেই এটা সংরক্ষন ও প্রকাশ করতেন।

সেকালে যে ছাপাখানা ছিল সেটি তো মধ্যযুগীয়। ট্রেডল মেশিনে ডিমাই বড় সাইজের কাগজ এক পৃষ্ঠা করে ছাপা হতো। কাগজটা মেশিনে যাচ্ছে। ধাপ করে একটি পাতা বের করে কোনো দিকে ফেলে দিচ্ছে। আবার আরেক পাতা আসছে, ছাপছে। এভাবে ঘণ্টায় ৩’শ থেকে ৫’শ কপি ছাপা হতো। পাতার পিঠ ঘুরিয়ে আরেকটায় বসিয়ে আবার ছাপানো হচ্ছে একেবারেই আদিম পদ্ধতি। আমাদের প্রিন্টিং প্রেস ১৯৫২ সাল থেকে আস্তে আস্তে পরিবর্তন হওয়া শুরু করলো। পাকিস্তান অবজারভার প্রথম রোটারি মেশিন আনে। মেশিনে গোল বড় বড় কাগজের রোল ঢুকিয়ে ছাপা শুরু হলো,একসঙ্গে সব কাগজ বেরিয়ে যায়। তারপর প্রকাশিত হলো আজাদ নামে আর একটি পত্রিকা। এর কিছুদিন পর প্রকাশিত হলো মর্নিং নিউজ। ১৯৬৫ সালের দিকে অবজারভার প্রথম ওয়েব অফসেট ইনট্রোডিউস করে। ফলে উন্নত হলো ছাপা। ছবি থেকে শুরু করে যেকোনো কিছুর ব্যাপারে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চল শুরু হলো। কালার হেডলাইন করতে চাইলে তাও করা যেত। এভাবেই আস্তে আস্তে সংবাদপত্রের বিকাশ বা পরিবর্তন ঘটতে লাগলো।

সেকালে ছিল হাতে কম্পোজ। প্রথম মনোটাইপ আনল মর্নিং নিউজ। অবজারভার নিয়ে এলো লাইনো টাইপ। বাংলা পত্রিকায় প্রথম মনো কম্পোজ শুরু করলো ইত্তেফাক। তারাই পরে লাইনো এনে প্রিন্টিং শুরু করল। ইত্তেফাকের পরে ধীরে ধীরে সব পত্রিকায় প্রযুক্তিটি স্থাপন শুরু করা হলো। দৈনিক পাকিস্তানেও প্রথম দিকে হাতে কম্পোজ করা হতো। তারা তখন হ্যান্ড কম্পোজে থেকে শুরু করে লাইনো শুরু হলো। লাইনো, মনো, তারপর এলো অফসেট। একালে দেশে যেটি পাওয়া যাচ্ছে তা মর্ডানাইজড অফসেট। এখানে পত্রিকা ছাপার সূচনাকালটি ছিল এমন—লাইনো টাইপে কম্পোজ করে পাতাটা দেখে রং দেয়া হতো। এরপর তিন টন ওজনের একটি লোহার প্রি দিয়ে চাপ দিলেই পাতায় সব ছাপ উঠে আসত। তারপর সে পাতায় গরম সিসা ঢাললে ছাঁচ বেরিয়ে আসত। সেই ছাঁচ পাতার ওপর চাপ দিয়ে ছাপা হতো। এটাকে লেটার প্রেস রোটারির প্রিন্টিং সিস্টেম বলা হতো। এর পরে এলো পে¬ট সিস্টেম। প্রথম দিকে পে¬ট করা খুব কষ্টের ছিল। একেকটি পে¬টে তখনকার দিনেই ১’শ টাকার ওপরে খরচ হতো। খরচ ও পরিশ্রম বাঁচাতে শুনা গেছে, জানা গেছে আব্দুল গনি হাজারী সাহেবই পে¬ট করার এ দেশীয় পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ছিলেন। পুরনো পে¬ট ঘষে তার ওপরের লেখাগুলো মুছে পে¬টটিকে শ্রেনিং করা হতো। শ্রেনিং নামে একটি মেশিন ছিল। একটা বড় চাকা ঘুরতে থাকে। সেটিতে কোটিং দেওয়ার জন্য আরেকটি মেশিন দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পে¬টের ওপর আস্তড়ণ দেওয়া হতো। ফলে ১’শ টাকার পে¬ট খরচ ২০ টাকায় নেমে গেল। একালে অবশ্য এ পদ্ধতির ব্যবহার নেই।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ামের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতায় খবরের কাগজ পিছিয়ে খুব একটা নেই। তবে সমস্যা হচ্ছে, এখন অসংখ্য সংবাদপত্র রয়েছে। যে কোনো শিল্পের জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন। প্রথমত, পুঁজি। শিল্প গড়ে ওঠে পুঁজি বা বিনিয়োগে। এরপর যাঁরা এই শিল্পে কাজ করেন, তাঁদের অবস্থা বিবেচনায় আনতে হয়। আর সর্বশেষ প্রয়োজন শিল্পের কাঁচামাল। যাঁরা এ কাজ করেন তাঁরা ভালোভাবে না থাকলে, পুঁজির সরবরাহ ঠিকমতো না হলে যে কোনো শিল্পে বিপর্যয় ঘটবে। যাঁরা এই সংবাদপত্র শিল্পটি পরিচালনা করছেন তাঁরা এই বিষয়গুলো না বুঝলে অন্তিমে তাঁরা বাজারে থাকবে না। হয় তাঁদের কেটে পড়তে হবে, না হয় তো বাদ পড়ে যাবেন। আধুনিক ব্যবস্থাপনার দিকে যদি তাঁরা এগিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে তাঁরা থাকবেন না।

দেশ স্বাধীন হলো। মাঝখানে খাওয়ার চিন্তা ছিল, দেশে দারিদ্রতা ছিল। এখন সে অবস্থা আর নেই, বরং শস্য থেকে শুরু করে অনেক কিছুই এখন উদ্বৃত্ত। দারিদ্র্যের হারও কমছে। দেশের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের অবস্থাও পাল্টেছে। আগে সংবাদপত্র ব্যক্তি পুঁজিতে গড়ে উঠত। এখন করপোরেট পুঁজি চলে এসেছে। তারপরও এই পেশা আগের সেই সম্মানজনক অবস্থায় নেই। তাকে সেই অবস্থায় নেওয়াও মুশকিল। কারণ করপোরেট ব্যবস্থাপনায় যে পরিমাণ দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহে ঘাটতি আছে। অন্যদিকে পুঁজিপতিদের গ্রহণেও ঘাটতি আছে। ফলে যে দু-একজন এদিকে আসেন, কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায় তাঁরাও কেটে পড়ছেন। এই শিল্পের পরিবেশ টিকিয়ে রাখার মতো অবস্থাও তো নেই। তবে সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ এখনো উজ্জ্বল। কারণ পত্রিকা পড়তে মানুষের ভালো লাগে।

(সুত্র: আলী হাবিব, কাকলী প্রধান ও রেনেসাঁ রহমানের সাথে দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খাঁনের একান্ত স্বাক্ষাতকার)






মন্তব্য চালু নেই