মেইন ম্যেনু

২৫ হাজার মামলায় আসামি পাঁচ লাখ নেতাকর্মী

সংশয়-আতঙ্কে বিএনপি নেতারা আত্মগোপনে

সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার মামলায় বিএনপির পাঁচ লাখ নেতা-কর্মী আসামি রয়েছেন আর কারাগারে আটক আছেন ১০হাজারের বেশি নেতাকর্মী।- বিএনপি সূত্র এমনটাই জানালেন। সঙ্গত কারণেই সংশয়-আতঙ্কে বিএনপির মধ্যম সারির নেতারাও রয়েছেন আত্মগোপনে।
বিএনপি শীর্ষ নেতারা কেউ আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে। এরই মধ্যে নতুন করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ‘গ্রেফতার অভিযানে’ সংশয় ও আতঙ্কে রয়েছেন দলটির মধ্যম সারির নেতারা।এ অবস্থায় দ্বিতীয় দফায় মামলায় পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই সীমিত দলীয় কর্মকা- থেকেও নিজেদের আড়াল করে রাখছেন তারা। তা ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার দীর্ঘসূত্রিতায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও প্রায় গতি হারিয়ে ফেলেছে।

নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশি হয়রানি, গ্রেফতার আতঙ্ক এবং নতুন করে আসামি হওয়ার শঙ্কায় ভালো নেই তারা। এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন অনেকে। মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বললেও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে কেউই নাম প্রকাশে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, যেসব নেতা-কর্মী সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, বেছে বেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে পুলিশ। এ অবস্থায় গ্রেফতার আতঙ্ক ও নতুন করে মামলায় পড়ার আশঙ্কায় অনেকেই দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন না। তবে আত্মগোপনে থেকে দলের জন্য কাজ করছেন বলে জানান তারা। আর যাদের নামে মামলা নেই বা জামিনে আছেন, তারা প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন।

সরকারের এই গ্রেফতার অভিযানের সমালোচনা করে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং আসন্ন পৌর নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সরকার দেশব্যাপী যৌথ অভিযানের নামে ধরপাকড় শুরু করেছে।

এ পর্যন্ত দলের তিন সহস্রাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা যাতে অংশ নিতে না পারেন, সরকার সেই ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করতে এই গ্রেফতার শুরু করেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘সারা দেশে যৌথ অভিযানের নামে পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাজার হাজার নিরীহ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করছে সরকার। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। সরকারের এই নীতি ভুল। এই বিষয়টি দেশে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে বলে আমি মনে করি।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম। একই অবস্থা দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানেরও। তার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, রায়ও দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঘোষিত হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বিএনপি নেত্রী এবং তারেক রহমানই নন, দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভীসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা একাধিক মামলায় বিচারের মুখোমুখি। বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অনেকে কারাগারে রয়েছেন।

সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রায় ২৫ হাজার মামলায় দলটির অন্তত পাঁচ লাখ নেতা-কর্মীরও বেশি আসামি বলে কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলায় বর্তমানে বিএনপির প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মী এখনো কারাগাওে রয়েছে বলে দাবি দলের।

এই পরিস্থিতিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ এবং সর্বশেষ রোববার নির্বাহী কমিটির সদস্য এম এম শাহরিয়ার রুমীর পদত্যাগে নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। দুই নেতার এই পদত্যাগ সরকারের দল ভাঙার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না সেটিও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন তারা।

বিএনপির মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীর্ষ নেতাদের এই পরিস্থিতিতে দলের নির্দেশনা অনুযায়ী সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ করছিলেন তারা। কিন্তু সম্প্রতি গ্রেফতার অভিযানে সমস্যায় পড়েছেন এসব নেতা। এরই মধ্যে দলের ভেতর গ্রেফতার অভিযানের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দলের পুনর্গঠনেও ব্যত্যয় ঘটছে। আর চিকিৎসার জন্য দুই মাস লন্ডনে অবস্থান করা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার দীর্ঘসূত্রিতায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও প্রায় গতি হারিয়ে ফেলেছে।

সর্বশেষ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারস ইনস্টিটিউশনে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ এর আলোচনা সভায় নেতা-কর্মীর উপস্থিতি ছিল তুলনামুলকভাবে কম। বিশেষ করে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্বার্থে মধ্যম সারির নেতারা যেখানে কর্মী বাহিনী নিয়ে উপস্থিত থাকতেন সবচেয়ে বেশি, সেখানে ওই দিন হাতে গোনা কয়েকজনের দেখা মিলেছে।

যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা জানান, তার নামে প্রায় ১৫টি মামলা রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে প্রতিনিয়তই তাকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। আপাতত দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি সীমিত হওয়ায় কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছেন নেতা-কর্মীরা। বিএনপি নেত্রী দেশে ফিরে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেবেন সে আশাও ব্যক্ত করেন এই যুবদল নেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের দেখা পাচ্ছেন না নেতা-কর্মীরা। ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহমেদ মামলায় কারাগারে, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে। যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। তবে জামিনে থাকায় আপাতত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে গত জানুয়ারিতে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের আগে থেকেই সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরবের দেখা মিলছে না। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বিভিন্ন মামলায় আসামি। তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে রয়েছেন। আত্মগোপনে আছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবুও। শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাসিমেরও দেখা পাচ্ছেন না নেতা-কর্মীরা। মামলায় তারাও আছেন আত্মগোপনে। একই অবস্থা ঢাকা মহানগরের মধ্যমসারির নেতাদেরও।

প্রতিদিনই দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন সর্বশেষ তথ্য দিয়ে জানান, শনিবার রংপুর থেকে ৭১ জন, চুয়াডাঙ্গায় পাঁচজন, সাতক্ষীরা নয়জন, রোববার চট্টগ্রামে ২৮২ জন, ঝিনাইদহে ১১ জন, নরসিংদীর রায়পুরে ১১ জন, গাজীপুরের কালিগঞ্জে সাতজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১১ জন, নোয়াখালী পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ, ছাত্রদলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হাসান সুমন, নোয়াখালী জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক কামাক্ষা চন্দ্র দাসসহ নয়জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার প্রতিদিন বিএনপির নেতা-কর্মীদের দিয়ে কারাগার ভরে ফেলছে। কারাগারের ধারণ ক্ষমতার বাইরে যেভাবে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে রাখা হচ্ছে, তাতে করে কারাগারে একটি মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।’






মন্তব্য চালু নেই