মেইন ম্যেনু

সবচেয়ে বড় রাসায়নিক দুর্ঘটনা

১৯৮৪ সালের ঘটনা। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতের একটি রাসায়নিক কারখানায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যায়। দুর্ঘটনাটি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে ২৫ হাজার মানুষ এতে স্রেফ মারাই যায় এবং অগুনতি মানুষ আহত হয়। ওই রাসায়নিক কারখানাটি যে অঞ্চলে অবস্থিত ছিল সেখানে তৎকালীন সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাস করতো। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠির বসবাসস্থলের মাঝে এরকম একটি কারখানায় দুর্ঘটনার কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি এবং পরবর্তী মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় তা বিশ্বব্যাপী সচেতন মানুষের কাছে আজও নগরায়নের নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির হয়ে আছে। আজও ভারতের সেই স্থানে জন্মগ্রহন করা শিশুদের মাঝে বিকলাঙ্গতা থেকে শুরু করে নানান রোগ দেখা যায়, যা মূলত ওই দূর্ঘটনা থেকেই সৃষ্ট। কিন্তু আজ অবধি ভোপাল দূর্ঘটনা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর একটিরও কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ভারত সরকার, উল্টো দেশটির কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্তের নামে অহেতুক কালক্ষেপন করা হয়েছে।

শনিবার সকালে ভারতের একটি নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে এসেছেন কিছু নারী, যাদের ছবি আমরা প্রান্তিক ভারতের ছবি হিসেবে বিভিন্ন গ্যালারিতে দেখতে পাই। আদালতে যারা আজ বসে আছেন তারা এসেছেন মূলত ভোপাল থেকে। মোট তিন প্রজন্ম ধরে তারা এই আদালত প্রাঙ্গনে আসছেন নিজেদের পাওনা বুঝে নিতে। তাদের প্রত্যেকেরই মনে ৩১ বছর আগে ঘটে যাওয়া ভোপাল দূর্ঘটনা এখনও দগদগে ঘা হিসেবে টিকে আছে। ইউনিয়ন কার্বাইড পেস্টিসাইড প্ল্যান্ট নামের যে কারখানাটিতে সেদিন রাতে দূর্ঘটনা ঘটেছিল, সেসময় কারাখানায় থাকা ৪২ টন প্রাণঘাতী বিষ মিথাইল সায়ানাইড মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে ছড়িয়ে যায় এবং কারখানা সংলগ্ন বস্তিতে থাকা ঘুমন্ত মানুষগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে। সেই আহাজারি আর নিষ্প্রভ হয়ে যাওয়া চোখগুলো আজও বেঁচে যাওয়া মানুষকে শিহরিত করে তোলে।

ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথম সপ্তাহেই আট হাজার মানুষ মারা যায়। এই মৃতদের মধ্যে প্রায় সবারই ফুসফুস এবং চোখগুলো স্রেফ পুড়ে গিয়েছিল। প্রথম সপ্তাহের মৃত্যুর মিছিল কিছুটা থামলেও পরবর্তীতে থেকে থেকে মানুষ মারা যায়। প্রত্যক্ষ কারণে শেষমেষ পঁচিশ হাজার মানুষ মারা এবং দশ হাজার মানুষ আহত হয়। তাই বলে যদি ভাবা হয়, দূর্ঘটনার ৩১ বছর পর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে তাহলে একেবারেই ভুল ভাবা হবে। কারণ আজও সেখানে যে শিশুরা জন্মগ্রহন করছে তাদের অধিকাংশই শারিরীকভাবে বিভিন্ন সমস্যায় অক্রান্ত। শুধু শারিরীক সমস্যাই নয়, অধিকাংশের ক্ষেত্রেই মস্তিস্ক বিকৃতি ও পেশি শীর্ণকায় হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। আর সেই কথাগুলো নিয়েই শনিবার আদালতের সামনে বসেছিলেন ভোপালের ওই নারীরা।

আদালত প্রাঙ্গণে বসে থাকা নারীরা আশা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ঔষধপ্রস্তুতকারক কোম্পানি দাউ কেমিক্যাল ওই দূর্ঘটনা বিষয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরবেন। কারণ দূর্ঘটনা পরবর্তীতেই ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে দূর্ঘটনার সময় ইউনিয়ন কার্বাইড নামের কোম্পানিটির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, অথচ দূর্ঘটনার দিন পর্যন্ত ইউনিয়ন কার্বাইড যে রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন করছিল তা দাউ কেমিক্যেলের জন্যই করা হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বারবার আদালতে হাজির হওয়া স্বত্ত্বেও আজ অবধি এই বিষয়টি কোনো সুরাহা হয়নি বললেই চলে। ভোপালের নারী আন্দোলনকারীদের পক্ষের আইনজীবি অভি সিং এবিষয়ে বলেন, ‘খোলাখুলি বললে, আমি বিস্মিত যে তাদের রাষ্ট্রীয় বিচারের উপর এখনও আস্থা রয়েছে।’

সবচেয়ে হতাশার কথা হলো, এতবড় দূর্ঘটনার পরেও তাৎক্ষণিকভাবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনার কোনো তদন্ত দাবি করা হয়নি। উল্টো এরকম একটি ঘটনা যে কোম্পানির নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতার কারণে ঘটতে পারে সেবিষয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হলেও ভারত সরকার যেন সেকথা বিশ্বাসই করতে চায়নি। আর এই কারণে ভোপাল দূর্ঘটনা যে গরীব শ্রমিকদের প্রতি অবহেলা এবং অসচেতনতার ফল তা আইনজীবিদের পক্ষে আদালতের কাছে প্রমাণ করা কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল।

ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানির নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান দূর্ঘটনার পর কাগজের মারপ্যাচে তাদের দায়িত্ব থেকে সরে দাড়ায়। এমনকি তাদের নিয়োগ দেয়া প্রতিষ্ঠানের কারণেই যে মাটি এবং পানির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তাও মানতে নারাজ তারা। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, আজও ভোপালের নদীগুলোর পানিতে বিষ পাওয়া যায় এবং ওই পানি খাবারের জন্য ব্যবহারতো দূরের কথা অন্যান্য সাধারণ কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

১৯৮৯ সালে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানির পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৭০ মিলিয়ন ডলার অর্থ দেয়া হয়। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে মোট ক্ষতির পরিমান প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। অথচ ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানি তাদের ইচ্ছে মাফিক ক্ষতিপূরণের অর্থ যোগান দিয়ে দিব্যি দায়মুক্তি পেয়ে যায়। ওই দূর্ঘটনার ঠিক ১৬ বছর পর্যন্ত দাউ কেমিক্যাল তাদের কোনো কাজেই ইউনিয়ন কার্বাইডকে নেয়নি।

গত বছরই ৯২ বছর বয়সে মারা গেলেন ইউনিয়ন কার্বাইডের মুখ্য কর্মকর্তা ওয়ারেন অ্যান্ডারসন। ভারতীয় আদালত থেকে বেশ কয়েকবার তার বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়েছিল কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে উপস্থিত না হওয়ার কারণে ভারতীয় আদালত তাকে আত্মগোপনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অথচ তিনি বহাল তবিয়তেই তার নিজ দেশে বসবাস করছিলেন মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত।

একটা সময় ভারত কৃষিপ্রধান ভূমি হলেও, বর্তমান ভারতের চেহারা মূলত শিল্পোন্নত। ভোপাল ট্রাজেডিকে সামনে রেখেই বহু বহু ভারি শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে দেশটিতে। লক্ষাধিক তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু এতবড় দূর্ঘটনার পরে আজও দেশটির অধিকাংশ শিল্প-কারখানাতেই নেই শ্রমিক নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ। প্রতিবছরই বিভিন্ন কারখানায় দূর্ঘটনায় অনেক নিরীহ শ্রমিক মারা যাচ্ছে।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই