মেইন ম্যেনু

সবাই চাইলেও অদৃশ্য বাঁধার মুখে ডাকসু নির্বাচন!

বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ছাত্রদের অধিকার আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ‘আতুড়ঘর’ এটি। কিন্তু দীর্ঘ ২৬ বছরেও নির্বাচন হয়নি দেশের ছাত্র আন্দোলনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় নির্দলীয় মঞ্চটির।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা সবসময় ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। নির্বাচন দিতে ভয়ে আছেন কিনা- বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এমন প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছেন তারা।

দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঝে মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। আর ‘ডাকসু চাই’ স্লোগানে বাম ছাত্র সংগঠনের আন্দোলন নিত্যদিনের। বিভিন্ন সময় এ নির্বাচনের দাবি তুলেছেন সুশীল সমাজও। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘তারা ডাকসু নির্বাচন দিতে আগ্রহী।’

আপতদৃষ্টিতে সবাই ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে। তাহলে এ নির্বাচন দিতে বাধা কোথায়?

ইতিহাস বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯২৪ সালে ডাকসু প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে এ সংসদের নেতৃবৃন্দ মনোনীত হতেন। পাকিস্তান আমলেও ডাকসু নির্বাচন হয়, স্বাধীনতার পরও এটি চালু থাকে। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে দু-দু’বার ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ৬ জুন অনুষ্ঠিত হয় এ নির্বাচন। এরপর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির এ কারখানা।

দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) টানা ২৬ বছর ক্ষমতায়। নিজেদের ‘গণতন্ত্রমনা’ বলে দাবি করলেও ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বকারী এ সংগঠনের নির্বাচন দিতে পারেনি তারা। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনসহ যেকোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তারা সে সাহস দেখাচ্ছে না।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সাবেক ছাত্রনেতা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হয়। সবাই এর কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ‘চ্যালেঞ্জ না নিতে পারা’কে দায়ী করেন। সরকারের নানা অজুহাত ও কালক্ষেপণের বিষয়টিও তুলে ধরেন কেউ কেউ।

ডাকসুর সাবেক নেতারা বলছেন, সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মুখে মুখে বললেও তারা মন থেকে ডাকসু নির্বাচন চান না। তবে এ নির্বাচন নিয়ে বিশৃঙ্খল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সম্ভাবনাকে অজুহাত হিসেবে দেখছেন অনেক ছাত্রনেতা। তাদের পরামর্শ হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নেয়ারও প্রস্তাব দেন তারা।

ডাকসুর সাবেক ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপার। গত ২৭ বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ফলে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় যে নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না।

ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার জন্য সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেন তিনি। বলেন, ‘সিনেট সদস্য হিসেবে আমি বিভিন্ন সময় বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’ তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন দিতে স্বস্তিবোধ করে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যাপার।

অধ্যাপক মাহফুজা খানম আরো বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে সরকার, ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সদিচ্ছা ও ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কিন্তু তারা কেন মাঠে নামছে না? শুধু প্রশাসন কিংবা সরকার চাইলে হবে না, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।’

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ‘অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি’ তৈরি হলে এর সমাধানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন ডাকসুর সাবেক এই ভিপি।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যেহেতু বলেছেন সেহেতু আমি মনে করি, ডাকসু নির্বাচন হতেই হবে। এ নির্বাচনে কে জিতবে, কে হারবে সেটা বড় বিষয় নয়; প্রশাসনকে এ চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে। তাদের সদিচ্ছা থাকতে হবে। প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্বাচন দিতে হবে।’

‘যেহেতু রাষ্ট্রপতি বিষয়টি অনুধাবন করেছেন, তিনি এটি বাস্তবায়নে সবাইকে সম্পৃক্ত করবেন’ বলেও আশা করেন অধ্যাপক মাহফুজা খানম।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায়ই ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। তিনিও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন রাখেন, ‘ডাকসু নির্বাচন দিতে কর্তৃপক্ষ ভয়ে আছে কিনা।’

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র চর্চা, সুন্দর ও চমৎকার পরিবেশ গড়ে তুলতে ডাকসুসহ সব ছাত্র সংসদে নির্বাচন দিতে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ বছরে প্রায় ৫০ জন ভিপি ও জিএস পেত। অন্যান্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এমনটা হতো। জাতীয় রাজনীতিতে তারা নেতৃত্ব দিতে পারত। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকার কারণে এ পথটা বন্ধ হয়ে গেছে।’

ডাকসুর সাবেক জিএস ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন অভিযোগ করেন, শাসক দল ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে এবং ক্যাম্পাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ রেখেছে।

তিনি বলেন, ‘তারা বিরোধী ছাত্র সংগঠনকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দিয়ে সেখানে গু-ামি, মাস্তানি, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করছে। দীর্ঘ ২৬ বছর ধর ডাকসু নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন হলে জাতীয় রাজনীতিতে কমপক্ষে ৪০ জন মেধাবী ছাত্র আসতে পারত। কিন্তু সেটি বন্ধ রয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে।’

বিএনপির এই নেতার দাবি, তারা ক্ষমতায় থাকাকালে তিন-তিনবার উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। তখনকার বিরোধী দলের (আওয়ামী লীগ) বিরোধিতার মুখে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে পারেননি তারা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির দেয়া মন্তব্যকে ‘অ্যাপ্রিশিয়েট’ (প্রশংসা) করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘এতো দিন তিনি কোথায় ছিলেন। তিনি কেন উদ্যোগ নেননি এবং সরকারকে নির্বাচন দিতে বলেননি। এখন সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন।’

ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীর বলেন, ‘সরকার ডাকসু নির্বাচন চাইলেও তাদের আন্তরিকতার অভাব আছে। তারা অন্তর থেকে এ নির্বাচন চান না। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায়। কারণ নির্বাচন দিলে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন করার সুযোগ তৈরি হবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খেয়ালখুশি মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। মূলত এ কারণে তারা নির্বাচন দিতে চায় না।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। অনেক দিন ধরে আমরা এ দাবি জানাচ্ছি। ডাকসু নির্বাচন দিতে প্রয়োজনে আবারও আন্দোলনে নামবো।’

ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে ডাকসু নির্বাচন সম্ভব। আমরা সবসময় ডাকসু নির্বাচন চেয়েছি, এখনও চাই। আমরা অধীর আগ্রহে বসে আছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে আমরা অংশগ্রহণ করব।’

ডাকসু নির্বাচন না দেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন দিতে আমরা অনেকবার ভিসি স্যারের কাছে দাবি জানিয়েছি কিন্তু তিনি শুধু আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি নির্বাচন দেবেন কিন্তু দেননি।’

‘ডাকসু নির্বাচন হলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে’- এমন আশঙ্কা এখন আর নেই জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আগে এ নির্বাচন নিয়ে মারামারি, হাঙ্গামা হতো। কিন্তু এখন সেদিন আর নেই। তবে অনেকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে পানি ঘোলা করতে পারে। ফলে অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটতে পারে।’

‘ডাকসু নির্বাচনের দাবি তুলতে সব ছাত্র সংগঠনকে একসঙ্গে বসা উচিত’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘এটা ছাত্রলীগেরও প্রাণের দাবি। ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির রোল মডেল হলো ছাত্রলীগ।’ ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অনেক দিন ধরে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি; কীভাবে এ নির্বাচন দেয়া যায়। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মহোদয়ও বলেছেন। আমরা দেখছি, চিন্তা ভাবনা করছি; দেখা যাক।’খবর জাগো নিউজের।






মন্তব্য চালু নেই