মেইন ম্যেনু

সম্ভ্রম বাঁচাতে গণআত্মহত্যা

‘হ্যালো?’… ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা কাপাকাপা কন্ঠস্বর। খুব মনোযোগ দিয়ে ওপারের বক্তার কথাগুলো শুনতে হচ্ছে। ‘আমাদের অবস্থা খুব খারাপ এবং এরচেয়ে আর খারাপ হতে পারে না।’ কন্ঠস্বরের মালিকের নাম জানা গেল না, তার আগেই প্রচণ্ড শব্দযোগে ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুধুই নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাসের পালা। কারণ ফোনের এপারে উপস্থিত আমিনা সায়েদ হাসান জানেন, হয়তো ফোন করতে গিয়ে ধরা পরায় তাকে হত্যা করা হলো। প্রতিদিন আমিনা এরকম বহু ফোন পান ইরাক এবং সিরিয়া থেকে।

সাবেক ইরাকি আইনজীবি আমিনা সায়েদ হাসান প্রতিদিন এরকম অনেক নারীর সঙ্গে কথা বলেন। ইরাক এবং সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের হাতে বন্দী থাকা নারীদের নিরাপদে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন তিনি। হাসান তার সর্বাত্মক দিয়ে চেষ্টা করেন ওই নারীদের পৈশাচিক অভিজ্ঞতা থেকে বের করে আনতে। কিন্তু সকলকে তার পক্ষে নিরাপদে বের করে নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। ইসলামিক স্টেট যখন প্রথম মসুল দখল করে নেয়, তখনই হাসান বুঝতে পেরেছিলেন যে, সিঞ্জারে থাকা ইয়াজিদিরা আর নিারপদ নয়। ‘আমরা শুরুর দিকে ভেবেছিলাম, তারা কেনই বা সিঞ্জারে আসবে? কারণ এখানেতো কোনো তেল নেই, তাহলে কি তাদের এখানে নিয়ে আসতে পারে?’

কিন্তু ইসলামিক স্টেট যোদ্ধারা সিঞ্জারে এসেছিল। তারা সিঞ্জারে কোনো তেলের ডিপো বা সামরিক কৌশলগত কারণে আসেনি। তারা এসেছিল সিঞ্জারের অন্য এক সম্পদ নিয়ে যাওয়ার জন্য, আর সেটা হলো সেখানকার মানুষ। প্রাথমিক ধাক্কাতেই তারা কয়েক হাজার ইয়াজিদি নারী এবং শিশুকে বন্দী করে নিয়ে যায় এবং সামনে পাওয়া সকল পুরুষদের হত্যা করে। আইএসআইএস কোরানের দোহাই দিয়ে অ-মুসলিম নারী এবং মেয়েদের বন্দী হিসেবে নেয় এবং ধর্ষণ করে। অবশ্য ইয়াজিদিদের প্রতি এই ভাবনার কারণে হলো, ইয়াজিদিরা এক খোদায় বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাস মতে, এই গোটা পৃথিবী একজনই সৃষ্টি করেছেন এবং সেই ময়ুরসদৃশ রক্ষাকর্তাই তাদের পালনকর্তা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই ইরাক এবং সিরিয়ায় বসবাসরত অন্যান্য মানুষেরা ইয়াজিদিদের শয়তানের উপাসক বলে আসছিল।
এভাবেই ইয়াজিদি নারীদের নিজেদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয় ইসলামিক স্টেট যোদ্ধারা

আমিনা নিজে ইয়াজিদি হওয়ায় অনেক ইয়াজিদি নারীই তার কাছে সাহায্যের জন্য আসেন। ‘মানুষ আমাকে চেনে এবং জানে। আমি সিঞ্জার থেকে এসেছি এবং একজন ইয়াজিদি। এমন অনেককেই আমি চিনি যাদের অপহরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই আমার আত্মীয়, প্রতিবেশি এবং তারা এখন আমাকে বিভিন্ন সময় সাহায্যের জন্য ফোন দেয়।’ আমিনা তার স্বামী খালিলির সঙ্গে মিলে নারীদের পাঁচার করে নিয়ে আসার একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছেন। বিপদে থাকা নারীরা আমিনাকে ফোন করলে তার স্বামী খালিলি ইরাক-সিরিয়ার ভয়াবহ সীমান্ত দিয়ে এক ভয়াল যাত্রার মধ্য দিয়ে ওই নারীদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত তারা শতাধিক নারী-পুরুষকে উদ্ধার করে এনেছেন।

2015_10_25_12_49_43_kKSHAsrnYuOc7jZvqjE3WomhgC1aYw_original

আমিনা প্রত্যেক ইয়াজিদিকে উদ্ধারের পর তাদের বক্তব্য শোনেন এবং ধৈর্য্য ধরে তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, বিপদ থেকে ফিরে আসার মানুষগুলোর অভিজ্ঞতার কথাগুলো যত্নে নথিভুক্তও করে রাখছেন তিনি। কিছু নারীর দুর্ভাগ্যের কথা তার মুখেই শোনা যায়, ‘গ্রাম থেকে তারা দুটো ট্রাক ভর্তি করে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। সেটা কোথায় আমি ঠিক জানি না। ট্রাকে জোর করে সবাইকে ঢোকানোর সময় এক নারী বাধা দিচ্ছিল, তখন সেই নারীর গলা বন্ধ করার জন্য তাকে হত্যা করা হয়।’

এভাবেই গত কয়েকমাস ধরে ইয়াজিদি নারীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আমিনা ও তার স্বামী খালিলি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়কার কিছু ঘটনা ইরাকের পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের মধ্যে যে বিশৃঙ্খলতা দেখা দিচ্ছে, তাতে তারা আরও মরিয়া হয়ে উঠছে। আরও পাশবিক কায়দায় হত্যা ও ধর্ষণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তারা। আমিনার কাছে এমনও সংবাদ আছে যে, কিছু ইয়াজিদি নারী ওই দুর্বিসহ অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের বাঁচাতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। ‘আমরা তাদের শুধুমাত্র উদ্ধার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও অনেক কষ্ট করে করতে হচ্ছে। আমাদের কাছে সংবাদ আছে শতাধিক ইয়াজিদি নারী আত্মহত্যা করেছে। এমনকি আমার কাছে কিছু মেয়ের ছবিও আছে যারা আত্মহত্যা করেছে। তারা যখনই বাঁচার সকল আশা হারিয়ে ফেলছে এবং বারবার তারা নানান যোদ্ধার কাছে বিক্রি হতে থাকে এবং ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তখনই মূলত তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এমন অনেকেই সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য।’



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই