মেইন ম্যেনু

“সহ্য করি এই ভেবে যে সন্তান অন্তত তাঁর পিতৃ পরিচয়টা পাবে, কিন্তু…”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“আমার সালাম নিবেন আপু। প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি দীর্ঘ এই চিঠির জন্য। ইদানীং প্রচন্ড মানসিক অশান্তিতে দিনানিপাত করছি। একজন সুপরামর্শকের খুব প্রয়োজন। আমি আপনাদের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়মিত পড়ি। তাই সঠিক পরামর্শদাতা হিসেবে আপনাকেই বেচে নিয়েছি।

আমার বর্তমান বয়স ১৯ বছর। দুই বছর আগে আমার বিয়ে হয়। তখন আমার বয়স সতের। আমি খুব ভাল ছাত্রী ছিলাম। দাখিলে সায়েন্স বিভাগ থেকে A+ পেয়েছিলাম। অনেক পড়ালেখার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বিয়েটা আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। যদিও বা বরপক্ষ বলেছিল আমাকে বিয়ের পর পড়ালেখা করাবে। কিন্তু বিয়ের তিন মাস যেতে না যেতেই তারা আমার পড়ালেখা বন্ধ করে দিল। যাই হোক, এবার মূল কথায় আসি। আমার স্বামী ছিল আমার প্রথম প্রেমিক। তাকে আমি খুব ভালবাসতাম। আমাদের বিয়ের একমাস পর সে বিদেশে চলে যায়। আমাকে শ্বশুর বাড়িতে রেখে যায়। বিয়ের পর প্রথম তিন মাস আমার শ্বশুর শাশুড়ি আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করেছিল। তারপর থেকে শুরু হল আমার জীবনের কালো অধ্যায়। আমার শ্বশুর শাশুড়ী পদে পদে ভুল ধরা, আমার সামান্য থেকে সামান্য দোষ পেলে রঙ মেখে, আমার স্বামীকে লাগিয়ে দেয়া, আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করা ইত্যাদি শুরু দেয়। তাদের কথা শুনে আমার স্বামীও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করত। তাকে আমি খুব ভালবাসতাম। তাই তার পক্ষ থেকে পাওয়া কোন কষ্ট আমি সহ্য করতে পারতাম না। তার মা বাবার কথা শুনে সে আমার সাথে কথা বলত না, আমাকে সময় দিত না। তা আমাকে অনেক কষ্ট দিত। খুব কাদঁতাম। শুধু আল্লাহর কাছে বলতাম আমার মনের কষ্টগুলো। আব্বু আম্মুকে এসব বলে কষ্ট দিতে চাইতাম না।

বিয়ের ছয় মাসের মাথায় আমার স্বামী দেশে আসে। দেশের আসার পরও তারা আমার স্বামীকে আমার সম্পর্কে ভুলভাল বলে আমার প্রতি তার মন বিষিয়ে তুলে। সে আবার বিদেশে চলে যায়। এভাবে এক বছর কেটে যায়। তারপর সে আমাকে বিদেশে নিয়ে যায়। আমি তখন কি যে খুশি হয়েছিলাম, তা একমাত্র আমার আল্লাহ জানে। ভাবলাম আমার কষ্টের দিন বুঝি শেষ হল। কিন্তু না। পরে জানতে পারলাম আমাকে কনসিভ করানোর জন্য তিন মাসের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম তা শুনে। বিদেশে যাওয়ার একমাসের মাথায় আমি কনসিভ করি। তখন সে আমাকে খুব কেয়ার করত, আমার সাথে ভাল ব্যবহার করত। তিন মাস পর সে আমাকে দেশে নিয়ে আসে। আবার তার বাবা মার কাছে রেখে সে বিদেশে চলে যায়। প্রেগনেন্সির সময়টাতে তারা আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করেছিল। একমাস আগে আমার বেবী হয় অপারেশনের মাধ্যমে। অপারেশনের পর পনেরদিন যেতে না যেতেই তারা আবার আমার সাথে আগের আচরণ শুরু করে দিল। বিশ্বাস করবেন আপু, তাদের কথায় অপারেশনের তের দিনের দিন থেকেই আমি বাড়ির কাজকর্ম শুরু করে দিই। রান্না করার সময় মসলার ঘ্রাণে আমার প্রচন্ড কাশি পেত, আর কাশলেই আমার অপারেশনের জায়গায় প্রচন্ড ব্যথা হত। তারপরও আমার যতটুকু সম্ভব আমার কাজ আমি করার চেষ্টা করেছি। তবুও আমি তাদের মন পাই না। তারা ছেলেকে লাগিয়ে দেয় যে, তোর বউ এটা করে না, ওটা করে না, আমাদের সেবা করে না ইত্যাদি। এসব শুনে সে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে।

সে কোন দিন আমাকে একটু সময় দেয় না। অথচ তার বাবা মা, ভাই বোন, ভাতিজা ভাতিজীদের সাথে প্রতিদিন ফোনে কথা বলতে পারে। সে আমাকে ফোন করে না, ইচ্ছে হলে দিনে একটা মেসেজ দিয়ে তার বাচ্চার খবর জিজ্ঞেস করে। আর তার বাবা মা যদি আমার সম্পর্কে কিছু লাগিয়ে দেয় তাহলে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে আমার সাথে ঝগড়া শুরু করে দেয়। আমার সম্পর্কে তার বাবা মা তাকে যাচ্ছে তাই বলে আমার প্রতি তার মন বিষিয়ে তুলেছে। সন্তান হওয়ার আগে আমার সাথে যেভাবে খারাপ ব্যবহার করত, এখন সন্তান হওয়ার পরে তা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এখন সে বলছে তার সাথে সম্পর্ক রাখতে হলে তার বাবা মায়ের কথামত চলতে হবে, তাদের সেবা করতে হবে। এখন তার প্রতি আমার ভালবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা,বিশ্বাস কোনটাই নেই। এই সম্পর্কের থেকে আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। এসব আমাকে ইদানীং খুব কষ্ট দিচ্ছে আপু। এখন তার সাথে আমার সম্পর্ক রাখার মোটেও ইচ্ছে নেই। কিন্তু সন্তানের কথা ভেবে তা আর পারি না। ইচ্ছে করছে আবার পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াব। কিন্তু তা আর সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। আর তাছাড়া আর সন্তানের বয়স মাত্র একমাস। এখন পড়ালেখা করলে তার দেখাশুনা করতে পারব না। আবার মন বলে, সব কষ্ট, অপমান সহ্য করে যাব। অন্ততপক্ষে আমার সন্তান তার পিতৃপরিচয়টা পাবে, একটা সুন্দর ভবিষ্যত পাবে। কিছুই বুঝতে পারছি না আপু কী করব।

আমাকে কিছু পরামর্শ দিন আপু। আপু, লেখাটি হয়তো সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখতে পারি নাই। কোনদিন কিছু লেখালেখিও করি নাই। ভুলগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”

পরামর্শ:
আপু, আপনার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির যে বর্ণনা দিলেন, তাতে কি আপনার সত্যিই মনে হয় যে সন্তান এই পরিবেশে ভালো থাকবে বা মানুষের মত মানুষ হবার সুযোগ পাবে? এই পরিবেশে বেড়ে উঠলে আপনার আদরের সন্তানও আসলে ক্ষুদ্র মানসিকতা নিয়েই বেড়ে উঠবে, যা মা হিসাবে নিশ্চয়ই আপনার কাম্য না? যে পিতা নিজের সন্তানের খোঁজ নেয়ার জন্য একটা ফোন কল করতে পারেন না দৈনিক, সেই পিতা সন্তানের জন্য ভালো কী করবেন সেটা সহজেই অনুমেয়।

যাই হোক আপু, আমার মনে হচ্ছে আপনার মূল সমস্যা আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের স্বামীর মন বিষয়ে তোলার ব্যাপারটি। কেবল আপনি নন, অসংখ্য নারী এই সমস্যার শিকার যাদের স্বামী প্রবাসী। দেখুন আপু, সংসারের দায় কেবল আপনার একার না, আপনার স্বামীরও। আর আপনি তাঁর দাসী বাদী না যে তিনি যা বলবেন তাই শুনতে হবে। এখন আপনার কাছে অনেক বড় একটি অস্ত্র আছে, সন্তান। বেশিরভাগ মানুষই নিজের সন্তানকে হারাতে চায় না। তাঁরা যেমন নানান ভাবে আপনাকে আঘাত করছে, আপনিও এখন সেই আঘাত প্রতিহত করবেন এই অস্ত্র দিয়ে।

আমি জানি আপু, মনের মাঝে ভালোবাসা না থাকলে জীবন কাটানো খুব কষ্টের। কিন্তু যেহেতু মানুষটা আপনার প্রথম প্রেমিক, ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন আপনারা, তাই ধরে নিচ্ছি সেই ভালোবাসা কোথাও না কোথাও এখনো আছে। আপনি যখন স্বামীর কাছে থাকবেন, তখন দেখবেন দুজনের মাঝে এই দূরত্ব একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। আর সন্তানকে কাছে পেলে অধিকাংশ পিতাই আঁকড়ে ধরেন, স্নেহ মমতা বেড়ে যায় অনেক খানি। সবচাইতে ভালো হয় আপনি যদি স্বামীর কাছেই চলে যেতে পারেন। আমি জানিনা সেটা সম্ভব কিনা। তাই স্বামীকে আপনি দুটি অপশন দিন। এক- আপনাকে ও বাচ্চাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে। দেশের যা অবস্থা, তাতে দেশের বাইরেই আপনাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে-এইসব বুঝিয়ে তাকে রাজি করাতে পারেন কিনা দেখুন। আর যদি রাজি না হয়, তাহলে বলুন যে তিনি দেশে না ফেরা পর্যন্ত আপনি আপনার বাবার বাড়িতে থাকবেন। কারণ অসুস্থ শরীরে এত কাজ করতে পারেন না আপনি। আর আগে তো কখনো বাচ্চা মানুষ করেন নি, মায়ের কাছে থাকে থাকলে আপনার হেল্প হবে। বাবার বাড়িতে থাকতে না দিলে আপনাকে একা বাসা ভাড়া করে রাখতে হবে, কিন্তু কিছুতেই তাঁর পিতামাতার সাথে থাকবেন না আপনি। নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। স্বামীকে কঠোর ভাষায় জানাবেন যে সে যদি আপনার কোন ইচ্ছাকেই মূল্য দিতে না পারে, তাহলে যেন আপনাকে তালাক দেয়, এভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে পারবেন না আপনি। এবং আপনিও নিজেও তাহলে মন শক্ত করতে শুরু করুন একটা ফাইনাল পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।

আর আপু, লেখাপড়া করলে সন্তানের দেখাশোনা করা যায় না, এটা একেবারেই ভুল ধারণা। অনেক মেয়েই বাচ্চা নিয়েই লেখাপড়া করছে। মায়ের বাসায় থাকলে লেখাপড়া শান্তিতে চালিয়ে যেতে পারবেন আপনি। বাচ্চার ভবিষ্যৎ ভেবে হলেও আপনার উচিত লেখাপয়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তাহলে আর কে আপনাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। শ্বশুরবাড়ি মেয়েদের লেখাপড়া এইজন্যই বন্ধ করে দেয় যেন ইচ্ছামত অত্যাচার করতে পারে। এই সুযোগ তাঁদের দেবেন না আপু।প্রিয়.কম






মন্তব্য চালু নেই