মেইন ম্যেনু

সাইজ জিরো ও প্রাচ্যের নারী

আজকাল কিশোরী-তরুণীদের যদি বলা হয়, বাহ্ তোমাকে তো বেশ দেখাচ্ছে, একটু স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে মনে হয়। ব্যস আর যাবে কোথায়! পারলে তক্ষুণি আত্মহত্যা করতে যায়। আর যদি বলা হয়, এত শুকিয়েছ? তখন খুশিতে আরও এক দফা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। তরুণীদের মধ্যে আলোচনার প্রধান বিষয় কীভাবে আরও পাতলা হওয়া যায়। পাতলা হওয়ার যখন আর শেষ থাকে না, তখন তাকে বলা হয় সাইজ জিরো।
ব্রিটিশ রাজবধূ ডায়ানা শুকনা থাকার জন্য প্রায়ই না খেয়ে থাকতেন। খেলেও খাওয়ার পর গলায় আঙুল দিয়ে বমি করে দিতেন, যাতে খাবারটা গায়ে না লাগে। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাথা ঘুরে পড়েও গিয়েছিলেন কয়েকবার।
অসুস্থ হয়ে পড়া বা শরীর খারাপ হয়ে যাওয়াতে কোনো ক্ষতি নেই, ক্ষতি যদি কেউ বলে বসে—একটু মোটা দেখাচ্ছে। তার চেয়ে মরে যাওয়া উত্তম। কেন? কারণ, যত বেশি শুকনা তত বেশি সুন্দরী। এই ধারণা থেকেই সাইজ জিরো। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র অভিনেত্রী কারিনা কাপুর কিছুদিন পর পর সাইজ জিরো হয়ে পর্দায় উদিত হন। তখন শুধু বলিউডই নয়, টালিউড-ঢালিউড থেকে শুরু করে এতদঞ্চলের অতিসাধারণ কিশোরীটি পর্যন্ত সাইজ জিরোতে থাকার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
আমরা একদিকে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য কত নীতিনির্ধারণ, কত প্রচারণা, কত প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। অপর দিকে নারীর শরীরকে গড়ে তুলতে চাইছি পাশ্চাত্যের চিন্তাধারায়। ভারত উপমহাদেশের নারীরা স্বাস্থ্যবতী। তাই বলে তাঁদের মেদবহুল বলা যাবে না। সরু কোমর, গুরু জঘন, সমৃদ্ধ স্তন কিন্তু স্বাস্থ্যবতী। অজন্তা ইলোরা বা কোনারকের মন্দিরের গায়ে যেসব নারীমূর্তি প্রতিভাত হয়, তাদের কারও শরীরই পৃথিবীর বিখ্যাত ক্ষীণতনু মডেল কেটি মস ও জোডি কিডের মতো হাড্ডিচর্মসার নয়। লা নুই বেঙ্গলির লেখক মির্চা এলিয়াদ তাঁর নায়িকার শারীরিক সৌন্দর্যে এক চিরকালীন ভারতীয় নারীকে আবিষ্কার করেছিলেন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই পর্যটনশিল্পকে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলছে। এখানে আত্মপরিচয়ই মুখ্য। একজন ইউরোপিয়ান-আমেরিকান আমাদের উপমহাদেশে নিশ্চয় আরও একটি আইফেল টাওয়ার বা স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে আসবেন না বা আসবেন না আর একটা নায়াগ্রা জলপ্রপাত খঁুজতে।
একেক দেশ জলবায়ু, মানুষের প্রকৃতি, বর্ণ, সংস্কৃতি, কৃষ্টিতে একেক রকম বৈচিত্র্য ধরে রাখে বলেই পৃথিবীটা বৈচিত্র্যময়। ভারত এখনো বিশ্বের মানুষের কাছে পর্যটনে এক নম্বরে। কারণ, এই একটি দেশের মানুষ খঁুজে পায় নানা বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, উপাসনা, আচরণ, চরিত্র, জলবায়ু ও ঔপনিবেশিক স্থাপনা। এখনো ভারত উপমহাদেশের নারীরা ভিন্ন মাত্রার সৌন্দর্যে বিশ্বের কাছে আদরণীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এ রকম একটি দেশও নারীর শারীরিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে প্রতিচ্যের কাছে হাত পাতে।
সুন্দরী প্রতিযোগিতা কোনো দেশের নারীর জন্যই সুস্থ ব্যবস্থা নয়। কিন্তু প্রচার, পয়সা ও প্রশংসা—এ তিন ‘প’-এর প্রলোভন থেকে বোকা মেয়েগুলোকে কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না। পুরুষের মনের মতো করে নিজেকে তৈরি না করতে পারলে নারীজন্ম ব্যর্থ—এ ধারণার বশবর্তী হয়েই বছর বছর কয়েক দফায় বিশ্বসুন্দরীদের মহাসম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আয়োজকেরা প্রধানত পুরুষ। নারীরা তাঁদের শরীর ছেড়ে দেন আয়োজকদের হাতে। আয়োজকেরা হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেবেন সুন্দরীদের কোথায় অসামঞ্জস্যতা, অসম্পূর্ণতা। তাঁরাই নির্ধারণ করে দেবেন কাকে কতটুকু খেতে হবে, ঘুমাতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে। এ নির্যাতন তো কোনো অংশেই মারধর করার চেয়ে কম নয়। এদেশীয় ক্ষুদ্র প্রয়াস একটি পণ্যের সৌজন্যে আয়োজিত সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এক সুন্দরী সেদিনও টিভির সাক্ষাৎকারে বলছিলেন যে প্রতিযোগিতা চলাকালীন তাঁর দৈনন্দিন আহারের জন্য যে খাদ্যতালিকা দেওয়া হয়েছিল, তা দেখে তিনি প্রথম কদিন আড়ালে চোখের পানি ফেলেছিলেন। দুমুঠো ভাত ধরে খাওয়ার জন্য তার প্রাণ ছটফট করত। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। এ না হয় গুটিকয়েক সুন্দরীর জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী তাবৎ কিশোরী-তরুণীদের মধ্যে।
এখন ঘরে ঘরে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, টিভি, কেবল লাইন। হাতে স্মার্টফোন। আকাশের মতো উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি। আজ গ্রামগঞ্জের সাধারণ কিশোরীরাও খেয়ে না-খেয়ে বিশ্বসুন্দরীদের আদলে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইছে। ফলে পরিমিত আহারের অপর্যাপ্ততায় তারা পেপটিক আলসারে ভুগছে। লেখাপড়া বা অন্যান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালো ফলাফলের জন্য শরীরে যেটুকু শক্তি প্রয়োজন, তা পাচ্ছে না। সৃষ্টিশীল কাজ করার জন্য যে মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রম বা অনুশীলন লাগে, অনাহারে থেকে তা অর্জন সম্ভব নয়। ওদিকে পুরুষ মডেলরা কিন্তু শক্তসমর্থ, পেশিবহুল। শুধু তন্ত্রেই দমন সম্ভব নয় জেনে পেশিও প্রস্তুত রাখা। কিন্তু নির্বোধ মেয়েগুলো সুন্দরের আদর্শ অনুকরণ করতে গিয়ে কেবলই সৌন্দর্যচর্চায় মগ্ন থেকে মেধার অনুশীলন শূন্যের কোঠায় পৌঁছে দিচ্ছে।
সমাজ ধারণা দিয়েছে, যে নারী যত কোমল, যত নরম, যত দুর্বল; সেই নারী তত বেশি গ্রহণযোগ্য পুরুষের কাছে। ললিতলবঙ্গলতিকা। শক্তসমর্থ নারীদের নাকি কোনো কমনীয়তা থাকে না। পুরুষ তো নারীকে দেখেই আকৃষ্ট হবে, পুরুষকে দেখে নয়। তাই নারীদের শরীরচর্চার জন্য ব্যায়ামের যেসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়, সেখানে যাতে নারীর পেশি উন্নত না হয় তার ব্যবস্থা থাকে। নারীকে হতে হবে নারীর মতো, ফুলের আঘাতে যে মূর্ছা যায়। নারীরা যাতে মার খেয়ে পাল্টা জবাব না দিতে পারে, তারই শুভ সূচনা ঘটে ওই সব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।
সেদিন কোনো এক বিয়ের অনুষ্ঠানে একজন নামকরা মডেলকে দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। তাঁকে র্যাম্পে বা টিভির কোনো অনুষ্ঠানে যে রকম শারীরিক গঠনের দেখায়, বাস্তবে তিনি তার অর্ধেকেরও কম। হাতগুলো প্যাঁকাটির মতো। কোমর এতই সরু, যেন কেবল মেরুদণ্ড–সর্বস্ব। গলার নিচে সৌন্দর্যাস্থি ইথিয়োপিয়ার পুষ্টিহীন শিশুদের কথা মনে করিয়ে দিল। গলা ভাঙা। (অনেকে গাল ভাঙা দেখানোর জন্য গালের দুই দিকের দুই পাটি করে দাঁতও তুলে ফেলতে নাকি দ্বিধা করে না!) তার ওপর এমন মেকআপ, মনে হচ্ছিল মিসরের হাজার বছরের মমি। একেই আবার টিভিতে অনেক সুন্দর ও উজ্জ্বল স্বাস্থ্যে দেখায়। জিজ্ঞাসা করেছিলাম একজন মডেল প্রশিক্ষককে—এর কারণ কী? তিনি বললেন, বাস্তবে একজন মডেল যে রকম শারীরিক গঠনের, ক্যামেরায় তাঁকে তার চেয়ে বড় দেখায়। কী সর্বনাশ! কেবল ক্যামেরার কারণে মডেল মডেলিং-সিনেমা-টিভির মেয়েদের হাড়গিলে-দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে জীবন কাটাতে হবে? নারীদের এ হাল দেখেই বোধ হয় ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উল্লেখ করেছে, ‘দেয়ার ইজ এ নিড ফর এ মোর রিয়ালিস্টিক বডি সেফ টু বি শোন অন টেলিভিশন অ্যান্ড ফ্যাশন ম্যাগাজিন।’ প্রযুক্তিতে বিশ্ব কোথায় না পৌঁছেছে? সাগরতলে বিন্দুসম প্রাণী, আমাজনের গহিন অরণ্যের নামহীন পতঙ্গ বা মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের ভেতরের ছবি তুলে আমাদের বিস্ময়ের সীমাকে ক্রমশই প্রসারিত করে চলেছে যে ক্যামেরা, তা নারীদেহকে তার বাস্তব দেহের আকৃতিতে তুলে আনতে পারবে না, ক্যামেরার অযোগ্যতার কারণে নারীকে না খেয়ে খেয়ে অস্থিচর্মসার হয়ে আত্মতৃপ্তির হাসি হাসতে হবে, আত্মরক্ষার সামান্য শক্তিটুকুও ধরে রাখা যবে না—প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির এই যুগে তা মেনে নেওয়া যায়? বরং স্বাস্থ্যবতীকে কীভাবে ক্ষীণকায় দেখানো যায়, সে রকম কারিগরি ব্যবস্থা থাকা উচিত। নাকি নারীকে দমিয়ে রাখার পুরুষতান্ত্রিক দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করার মানসে ক্যামেরার এই বিশেষ দিকের প্রযৌক্তিক উন্নয়নের প্রয়োজনই বোধ করেন না মহান ক্যামেরা-বিজ্ঞানীরা?
তাই প্রশ্ন, যদি বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় আফ্রিকার কালো মেয়ে কালোই থাকে, চীন-জাপানের মেয়ের চোখ-নাক খর্ব থাকে, তাহলে শারীরিক গঠনে কেন মেয়েরা নিজ নিজ দেশের প্রকৃতি ধরে রাখবে না? কেন ভারত উপমহাদেশের মেয়েরা উজ্জ্বল স্বাস্থ্যের প্রতিনিধিত্ব করবে না? খোলা আকাশ সংস্কৃতির পরেও পাশ্চাত্যের ফ্যাশন, ধ্যান-ধারণা প্রাচ্যে পৌঁছাতে সময় লাগে। আমাদের মেয়েরা সাইজ জিরো হয়ে ওঠার জন্য যখন কসরত করছে, তখন পাশ্চাত্যে কিছু নারী সংগঠন বিশেষ করে ভিক্টোরিয়া বেকহাম, কেটি গ্রিনের মতো সুন্দরীরা এ অবস্থা থেকে নারীদের বেরিয়ে আসার জন্য আন্দোলন করছেন। অস্কার বিজয়ী লুপিতা নিয়ঙ্গো ঠিকই বলেন, ‘আমি এই ধারণাই প্রচার করব যে সৌন্দর্য কারও ঠিক করে দেওয়া ব্যাপার নয়, বরং সেটা হলো নারীকে তাঁর নিজের মতো প্রকাশ করতে দেওয়া।’

উম্মে মুসলিমা, কথাসাহিত্যিক।
[email protected]



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই