মেইন ম্যেনু

সাইবার বিদ্রোহ : কেমন আছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ?

কদিন আগে সৌদি আরব সরকারের প্রায় ৬১ হাজার গোপনীয় নথিপত্র ফাঁস করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে আবার আলোচনায় এসেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তাঁরা দুনিয়া কাঁপানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস। প্রায় একই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, তবে সেটা যতটা না সৌদি নথিপত্র ফাঁস করার জন্য, তার চেয়ে বেশি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর অতি গোপনীয় কিছু নথিপত্র ফাঁস করার ফলে।

১৯ জুন উইকিলিকস ওয়েবসাইটে সৌদি নথিপত্র ফাঁস হলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে খুব একটা সাড়া জাগেনি। কিন্তু বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ২৩ জুন এনএসএর অতি গোপনীয় নথিপত্র উইকিলিকসে ফাঁস হওয়ার পর। ওই সব নথিপত্রের ভিত্তিতে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও প্রচার করে, এনএসএর গোয়েন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের ওপরে গোপনে নজরদারি করে আসছে।

গত ১০ বছরে তারা বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদসহ তাঁর দুই পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করেছে। এই খবরে ভীষণ খেপে গেলেন প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ, সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করলেন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চিত করুন যে আপনার গোয়েন্দারা এখন আর আমার ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করছে না। প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বভাবতই বিব্রত হলেন। কারণ, ফ্রান্স আমেরিকার ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের একটি। তিনি প্রেসিডেন্ট ওলাঁদকে ‘দ্ব্যর্থহীন’ ভাষায় বললেন, আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা এ রকম ‘অগ্রহণযোগ্য’ চর্চা অতীতে হয়ে থাকলে তিনি এর অবসান ঘটাতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।

এসব যখন চলছে, তখন যাঁর জন্য এসব, সেই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের অবস্থা অনেকটা গর্তবাসী ইঁদুরের মতো। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি আটকা পড়ে আছেন লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে। রুপালি দাড়িগোঁফে ঢেকে গেছে তাঁর মুখমণ্ডল; শেষ কবে তিনি সূর্যের দেখা পেয়েছিলেন, খোলা সতেজ বাতাসে শেষ কবে বুক ভরে শ্বাস নিতে পেরেছিলেন—এসব এখন দিন গুনে হিসাব করার বিষয়।

আসলে, ২০১২ সালের ১৯ জুন লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে ঢুকে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ারও দেড় বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে তাঁর শৃঙ্খলিত দশা। ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর লন্ডন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার উদ্দেশ্যে এক থানায় হাজির হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে, পরদিন আদালতে নেয়। তিনি জামিনে মুক্তির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁর স্থান হয় কারাগারে। নয় দিন কারাবাসের পর কঠোর আইনি লড়াই, প্রবল জনমত আর সামাজিকভাবে শক্তিশালী ও খ্যাতিমান কজন জামিনদারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকগুলো কঠোর শর্ত সাপেক্ষে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বটে, কিন্তু সেটাকে মুক্ত জীবন বলা চলে না। কারণ, জামিনের শর্ত অনুযায়ী তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় এক ধনাঢ্য বন্ধু ভগান স্মিথের পল্লিনিবাসে, লন্ডন থেকে ৪০ মাইল দূরে নরফোকের এক গ্রামে। দিনরাত গোড়ালিতে একটা ইলেকট্রনিক ট্যাগ পরা অবস্থায় গৃহবন্দী হয়ে কাটাতে হয় তাঁকে, প্রতিদিন একবার নিকটবর্তী থানায় গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আসতে হয়।

তার পরের কাহিনি আমি প্রথম আলোয় অনেকবার লিখেছি, আমার অনূদিত ও সংকলিত উইকিলিকসে বাংলাদেশ বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা আছে। এখন, লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার পরের তিন বছরে সাধারণ মানুষের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নামটি যখন প্রায়-বিস্মৃত হতে চলেছে, তখন তাঁকে নিয়ে এই লেখার উপলক্ষ স্পষ্টভাবেই তাঁর সর্বসাম্প্রতিক তৎপরতা।

পৃথিবীর মানুষকে তিনি জানাচ্ছেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দমে যাননি; বরং তাঁর ও উইকিলিকসের নাম না-জানা (অ্যানোনিমাস) বিদ্রোহী বাহিনীর বিপুল কর্মযজ্ঞ আগের মতোই চলছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্য দিয়ে যারা পৃথিবীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্ছিদ্র-নিরঙ্কুশ করতে সচেষ্ট, বিশ্বের সাত শ কোটি মানুষকে শাসন করার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে যারা গড়ে তুলেছে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার দুর্গ, সেই দুর্গের আড়ালে বসে যারা অহেতুক যুদ্ধ বাধানো থেকে শুরু করে যাবতীয় রকমের দুষ্কর্ম করে চলেছে, যারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাসহ সব ধরনের স্বাধীনতার অধিকার সম্পূর্ণভাবে হরণ করতে চায়, মোদ্দা কথায়, প্রবল যে দুষ্ট লোকেরা পৃথিবীটাকে একটা অরওয়েলীয় রাষ্ট্রে (ইংরেজ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের কল্পনার সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্র) পরিণত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে, তাদের বিরুদ্ধে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তাঁর উইকিলিকস বাহিনী বিদ্রোহ চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু অ্যাসাঞ্জের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা দুঃসহ। লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসের ছোট্ট ভবনটির ভেতরে তাঁর জন্য বরাদ্দ জায়গা মাত্র ৫৯ দশমিক ২ বর্গফুট। ওই দূতাবাসে কোনো খোলা জায়গা নেই, হাঁটাহাঁটির কোনো সুযোগই তাঁর নেই। অথচ জাতিসংঘের ‘স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনার্স’ অনুযায়ী প্রত্যেক কারাবন্দীর প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা খোলা জায়গায় হাঁটার সুযোগ প্রাপ্য।

অ্যাসাঞ্জের স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যা আছে, বিশেষ করে তাঁর ফুসফুসে একবার সংক্রমণ হয়েছিল, ওই দূতাবাসে অবস্থানকালেই। ইকুয়েডর দূতাবাস কর্তৃপক্ষ যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল, অ্যাসাঞ্জকে যেন দূতাবাসের বাইরে হাঁটা বা শরীরচর্চা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। অসুস্থ হলে তিনি হাসপাতালে ভর্তিও হতে পারবেন না। তিনি ওই দূতাবাসের চৌকাঠের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করবে, প্রত্যর্পণ করবে সুইডিশ সরকারের হাতে।

সুইডেনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আছে, তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি; এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুইডিশ আদালত অ্যাসাঞ্জকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ২০১০ সালে। অ্যাসাঞ্জের আশঙ্কা, তিনি সুইডেনে গেলে সুইডিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে

বিচারের নামে প্রহসন করে মৃত্যুদণ্ড দেবে। অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে এই মর্মে নিশ্চয়তা চেয়েছেন যে তিনি ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে বের হলে তাঁকে সুইডেন বা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ করবে না। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার এ রকম কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করার জন্য ব্রিটিশ পুলিশ দিনরাত ইকুয়েডর দূতাবাসের চারপাশে অবস্থান করে; এ বাবদ তারা গত তিন বছরে ১১ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি অর্থ খরচ করেছে।

এ রকম অবস্থায় অ্যাসাঞ্জের জন্য একটা আশাব্যঞ্জক আবহ সৃষ্টি হয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের ফোনালাপ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার গোপনে রেকর্ড করার তথ্য ফাঁস করার পর। ফ্রান্স সরকারের পাশাপাশি দেশটির নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে; প্রায় ৪০ জন বিশিষ্ট নাগরিক দাবি তোলেন, অ্যাসাঞ্জকে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হোক। ফরাসি বিচারমন্ত্রী ক্রিস্তিয়ান তোবিরা এক ফরাসি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, তাঁর সরকার অ্যাসাঞ্জকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলে তিনি অবাক হবেন না।

অ্যাসাঞ্জের কাছে এটাকে একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে হয়; তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও ফরাসি জনগণের উদ্দেশে একটা খোলা চিঠি লেখেন, ৩ জুলাই ফরাসি পত্রিকা ল্য মঁদ দিপলোমাতিক-এ চিঠিটি প্রকাশিত হয়। সেই চিঠিতে অ্যাসাঞ্জ নিজের অবস্থা বর্ণনা করে লেখেন, দুষ্কর্ম সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করার কারণে তিনি রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার, তাঁর জীবন এখন হুমকির মুখে। ফ্রান্স ইচ্ছা করলে তাঁকে এই রাজনৈতিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু এর জবাবে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের কার্যালয় এক বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে আইনগত ও বৈষয়িক অবস্থানগত প্রেক্ষাপটে মিস্টার অ্যাসাঞ্জের সামনে কোনো বিপদের ঝুঁকি নেই; তা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও বলবৎ আছে; এসব বিবেচনায় ফ্রান্স তাঁর অনুরোধ রক্ষার্থে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এই বিবৃতি প্রকাশের পর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হলো, ফ্রান্স অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তখন উইকিলিকসের মুখপাত্র ও অ্যাসাঞ্জের বন্ধু ক্রিস্টিন হ্রাফন্সন সংবাদমাধ্যমকে বললেন, অ্যাসাঞ্জ ফ্রান্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেননি।

যা হোক, তাতে অ্যাসাঞ্জের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। ইকুয়েডর দূতাবাসের ওই বন্দিদশা থেকে তাঁর মুক্তির কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে উইকিলিকসের কর্মকাণ্ড থেমে যেতে পারে, এমন ভাবনারও কোনো কারণ নেই। অ্যাসাঞ্জের ওই বন্দিদশাতেই উইকিলিকস গত তিন বছরে বিভিন্ন দেশের সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ গোপনীয় নথিপত্র ফাঁস করেছে। প্রতিনিয়তই তাদের হস্তগত হচ্ছে আরও অনেক গোপনীয় নথিপত্র। প্রযুক্তিগত দিক থেকে উইকিলিকস এমন এক অপ্রতিরোধ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা সম্ভবত এখন শুধু জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ওপরই নির্ভরশীল নয়। তবে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে

থাকা এর অগণিত স্বেচ্ছাসেবী কর্মীর কাছে প্রধান মতাদর্শিক প্রেরণা তিনিই বটে। এই ‘হ্যাকার’ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের বিস্ময়কর প্রযুক্তি-দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারেন (মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাও বিভিন্ন রাষ্ট্রের অতি গোপনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে ‘হ্যাকিং’-এর মাধ্যমে), কিন্তু তা না করে উইকিলিকসের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে তাঁরা যা করছেন, তাঁদের কাছে সেটা একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম। একুশ শতকের পৃথিবীর জন্য এ রকম সংগ্রাম খুব প্রয়োজন।

মশিউল আলম: সাংবাদিক।
[email protected]






মন্তব্য চালু নেই