মেইন ম্যেনু

সাকিবে স্বস্তি, মুশফিকে অস্বস্তি

সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে গত কয়েক বছর ধরে যারা খেলছেন, তাদের সবার মধ্যে সেরা কয়জন যদি বেছে নেওয়া হয়, তবে সেই তালিকায় অনায়াসে জায়গা পাবেন সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম।

গত কয়েক বছরই কেন, সর্বকালের সেরাদের তালিকায়ও জায়গা পাওয়ার দাবিদার এ দুজন। বাংলাদেশ দলের অন্যতম প্রধান ভরসা সাকিব আর মুশফিক।

ব্যাটে-বলে অধিনায়ক মাশরাফির ভরসার অন্য নাম সাকিব। উইকেটের পেছনে বিশ্বস্ত হাত আর দারুণ কার্যকর ব্যাটিংয়ে আস্থার অন্য নাম মুশফিক। মাশরাফি বাহিনীর ভালো করার পাথেয় অনেকটা নির্ভর করে এ দুজনের উপর। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, মাশরাফির দল এখন একক কারো সাফল্য-ব্যর্থতার উপর নির্ভর করে না। প্রতিনিয়ত সোনা ফলিয়ে যাওয়া মাশরাফি নামক এক জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় টাইগার বাহিনী এখন একসাথে লড়ে; ‘টিম বাংলাদেশ’ হয়ে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরায়।

তবু, দলের সাফল্যের জন্য সাকিব-মুশফিকের ভালো করাটা অত্যন্ত জরুরী। ব্যাটিংয়ে মিডল অর্ডারে তাদের কাছ থেকে কার্যকর ইনিংসই আশা করে। সেই আশার প্রতিদান তারা দিয়েছেনও। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে কি হলো সাকিব-মুশফিকের? টানা ব্যাটিং ব্যর্থতার বৃত্তেই যেন তাদের ঘুরপাক! টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সর্বশেষ দুই ম্যাচে সাকিব ফেরার ইঙ্গিত দিয়ে বাংলাদেশ দলে স্বস্তির সুবাতাস ছড়ালেও মুশফিক পারছেন না ব্যর্থতার দেয়াল ভাঙতে। তাকে নিয়ে তাই অস্বস্তিটা রয়েই যাচ্ছে।

অসাধারণ এক ক্রিকেটার সাকিব। কালেভদ্রে এরকম প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। বাংলাদেশ দলের অনন্য প্রতিভা সাকিব গত কিছুদিন ধরে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। তার ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসহীনতা, বোলিংয়ে ছন্নছাড়া ভাব প্রকট হয়ে ধরা পড়ছিল। গত বছর জুনে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে পর পর দুটি ফিফটির পর সাকিব তিন ধরনের ক্রিকেটে খেলেছেন ২০টি ইনিংস। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ ইনিংস ৫০*। এটিও গত ১৬ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে করা। সাকিবের আগের ১৯টি ইনিংস হচ্ছে এরকম; ৩৫ (টেস্ট); ৪৮, ০*, ১৬ (ওয়ানডে); ২৬, ৮, ২০*, ২৭*, ৩, ৪, ৩, ১৩, ৩২, ৮, ২১, ৫, ০* ও ১৭*। মোটে ৩৩৬ রান। এই ২০ ম্যাচে সাকিবের উইকেটসংখ্যা ২৫টি। তন্মধ্যে সেরা বোলিং ফিগার ৪/১৫। তাও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে, গত ১৩ মার্চ ওমানের মতো দুর্বল দলের বিপক্ষে।

এই পারফরম্যান্স কি ‘সাকিবীয়’? সাকিব মানেই অসাধারণ কিছু, এই পরিসংখ্যান থেকে তা উপলব্ধি করার মতো? ক্রমাগত ব্যর্থতার চোরাবালিতে ডুবতে থাকা সাকিব এ সময়ের মধ্যেই টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে সেরা অলরাউন্ডারের মর্যাদা খুইয়েছেন। ওয়ানডেতেও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তকমা নড়বড়ে হয়ে আছে।

তবু আশার ফল্গুধারা মিলছে কিছুটা। ব্যর্থতাকে পরাজিত করে সাকিব আবার স্বমহিমায় ফিরছেন, সেই ইঙ্গিতই যেন মিলছে। সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে ওমানের বিপক্ষে ওই বোলিং আর ১৬ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ৫০ রানের ইনিংসটি। নিজেকে হারিয়ে খোঁজা সাকিব যেন আবার ফিরে পাচ্ছেন নিজেকে।

‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ বলা হয় তাকে। মুশফিকুর রহিম। ছোটখাটো গড়নের এই মানুষটার ভেতর যে অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভা লুকিয়ে আছে, প্রথম দেখায় সেটা কেউই টের পাবে না। বাংলাদেশ দলের অন্যতম ব্যাটিং ভরসা মুশফিক। কতোবারই তো দলকে বিপদের গর্ত থেকে টেনে তুলে নিরাপদ বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই দুরন্ত প্রতিভার মুশফিক গত কিছুদিন ধরে কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছেন! কিছুতেই হাসছে না তার ব্যাট। ক্রমেই যেন আত্মবিশ্বাসহীনতার তলানিতে এসে ঠেকছেন সবার প্রিয় মুশি।

গতবছর নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের পর মুশফিককে ঠিক ‘মুশফিকের মতো’ দেখাচ্ছে না। তিন ম্যাচের ওই সিরিজের প্রথম ম্যাচেই মুশির ব্যাট থেকে এসেছিল দারুণ এক সেঞ্চুরি। ওই সিরিজের আরো দুই ওয়ানডেসহ এরপর মুশফিক খেলেছেন ১৫ ইনিংস। এই ১৫ ইনিংসে তার রান হচ্ছে এরকম; ২১, ২৮, ২, ৯, ২৬, ২৪*, ১৬*, ৪, ৪, ১২, ৪, ০ ও ১৮। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ইনিংস ২৮ রানের; গত নভেম্বরে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে। সবমিলিয়ে রান মাত্র ১৬৮!

এ কোন মুশফিক! এই মুশফিককে চেনা যাচ্ছে একটুও? লিটল বয়ের ব্যাটের হাসি কোথায় মিলিয়ে গেল! কেন এই ক্রমাগত ব্যর্থতার চোরাবালিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন মুশফিক? মুশফিক সর্বশেষ যে ৬টি ম্যাচে উইকেটকিপিং করেছেন, সে ম্যাচগুলোতে তিনি ক্যাচ ধরেছেন ৩টি, স্ট্যাম্পিং একটা। এ ৬টি ম্যাচেই উইকেটের পেছনে সেই বিশ্বস্ত মুশফিককে খুঁজে পাওয়াটা অনেক কঠিনই ছিল। সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে, বুঝতে পারছেন কি মুশফিক? কিংবা দলের কোচ হাথুরেসিংহ?

সাকিব-মুশফিক, দুজনই দলের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাশরাফি বাহিনী এখন এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে ক্রমাগত ব্যর্থ কাউকে দলে রাখাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দল কিংবা দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কিভাবে দলে জায়গা পাওয়া যায়। সুতরাং, এ বিষয়টা সাকিব-মুশফিককেও উপলব্ধি করা উচিত। তাদের ক্রমাগত ব্যর্থতা যাতে কাউকে বলার সুযোগ না দেয়, তারা ফুরিয়ে গেছেন।

২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ। সুপার টেনে প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের পর জয় এখন আমাদের জন্য অতীব জরুরী। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হারের পর তেতে আছে অজিরাও। সুতরাং, দলের সবাইর ভালো করা ছাড়া বিকল্প নেই। সাকিব-মুশফিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ফর্মে ফিরবেন পুরোদমে, এমনটাই প্রত্যাশা।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই