মেইন ম্যেনু

সাগর গভীরে আগ্নেয়গিরি!

আগ্নেয়গিরির কথা ভাবলেই সবসময় আরেকটা শব্দ মাথায় ঘুরেফিরে চলেই আসে। আর সেটি হচ্ছে লাভা। আগ্নেয়গিরি থাকবে আর তাতে লাভা থাকবেনা? কিন্তু কেমন হবে বলুন তো যদি সত্যিই আগ্নেয়গিরি থেকে গরম লালচে লাভার পরিবর্তে বেরিয়ে আসে ঠান্ডা কোন তরল। আর তারওপর যদি আগ্নেয়গিরিটির অবস্থান হয় মাটির একদম তলদেশে তবে? ভাবছেন মিথ্যে বলছি? কিন্তু না। সত্যিই এমন পানির তলায় চুপচাপ বছরের পর বছর ধরে বসে থাকা আগ্নেয়গিরিকেও পরম যত্নে লুকিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। সাগরের আরো অনেক অজানা রহস্যের পাশে নাম লিখিয়েছে আগ্নেয়গিরির। ঠান্ডা লাভা উদগীরন করা পানির নীচের আগ্নেয়গিরির। আসুন জেনে নিই।

শীতল আগ্নেয়গিরি

২০০৯ সালের কথা। আর্কটিক নেট প্রকল্পের আওতায় গবেষনা কাজের জন্যে কিছু বিজ্ঞানী সেবার রওনা হন কানাডার উত্তরে ও আলাস্কার খুব কাছে অবস্থিত বিওফোর্ট সমুদ্রের দিকে। আর সেসময়ই হঠাৎ পানিতে একটা গোলাকার জিনিসের আভাস পান তারা। যদিও খুব দ্রুতই সেটা উধাও হয়ে যায়, মনে করা হয় সেটা একটি সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরই উদগীরন ছিল। মিথেন গ্যাসের চাপের কারণেই এমনটা উদগীরনে বাধ্য হয় আগ্নেয়গিরিগুলো- এমনটাই ধারনা সবার। তবে সেবার হালকাভাবে সবটা খেয়াল করলেও ২০১৩ সালে সবটা অনেক কাছ থেকে ভালো করে দেখার জন্যে, শীতল আগ্নেয়গিরিকে আরো ভালোভাবে জানার জন্যে সমুদ্রের নীচে, আগ্নেযগিরির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিজ্ঞানী দল।

অক্টোবরে শুরু হয় কাজ। পানি যখন পুরোপুরি জমে যায়নি এমন একটা সময় বেছে নিয়ে পানির নীচে এক জানালার একটি যান নিয়ে ডুব দেন বিজ্ঞানীরা। চলে যান আগ্নেয়গিরির একেবারে কাছটিতে। দেখতে পান বিশাল এক আগ্নেয়গিরিকে। যাকে একপাশ দিয়ে একবারে দেখে পুরোটা বোঝার উপায় নেই। প্রথমেই আগ্নেয়গিরিকে ভালোভাবে বুঝতে সেই এলাকার একটি বিস্তারিত মানচিত্র এঁকে নেন বিজ্ঞানীরা যন্ত্রের সাহায্যে। কিন্তু পুরো মানচিত্র পাওয়ার পর অবাক হয়ে খেয়াল করেন তারা যে সেখানে আসলে একটি নয়, বরং ৩০ মিটার লম্বা মোট পাঁচটি শীতল আগ্নেয়গিরি রয়েছে ( বিবিসি )।

আগ্নেয়গিরির রহস্য

পানির নীচে আগ্নেয়গিরি নিজেই একটি মুর্তিমান আগ্রহ আর রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু সবার জন্যে। কিন্তু এই শীতল আগ্নেয়গিরিদেরকে আরো ভালো করে জানতে গিয়ে গবেষকেরা খুঁজে পান আরেকটি নতুন রহস্যের। আর সেটাও এই আগ্নেয়গিরিকে ঘিরেই। পানির নীচে দাড়িয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিগুলো যতটা না অদ্ভূত, ঠিক তেমনি আরেক বা তারো চাইতে বেশি অদ্ভূত আরেকটি জিনিস হচ্ছে এই আগ্নেয়গিরির ভেতরে বাস করা কীটগুলো। বছরের পর বছর যাদের কেটে যায় অন্ধকারে, পানির নীচে, সেই মিথেন গ্যাসের সাথে ( স্ন্যাপজু সায়েন্স )!

কিন্তু কী করে এভাবে এত-শত বছর বেঁচে রয়েছে এরা এই আগ্নেয়গিরিগুলোর ভেতরে? আর কি করেই বা করে চলেছে বংশবৃদ্ধি? এতদিনের অজানা এই কীটগুলো দিনকে দিন যতটা বেশি মানুষের জানার কাছাকাছি আসছে, ততটাই বেশি বাড়িয়ে তুলছে মানুষের আগ্রহ। নিজেদেরকে নিয়ে, নিজেদের টিকে থাকাকে নিয়ে।

আগ্নেয়গিরিকে নিয়ে কাজ করতে গিয়েই সেবার বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন এর গোলাকার মুখ আর প্রতি বছর প্রায় ২৭ মিলিয়ন টন মিথেন গ্যাস উদগীরিত করার কথা। আগ্নেয়গিরির উদগীরিত মিথেনকে প্রথমটায় মাটির নীচের তেলের সঞ্চয়াগারের চাপ থেকে উত্পন্ন বলে ধারনা করা হলেও পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা যায় সেখানে কেবল মিথেন নয়, রয়েছে অন্যসব গ্যাসও। আর এই মিথেনটাও কিন্তু তেলের চাপে উত্পন্ন কিছু নয়। বরং কোন ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা তৈরি এটি। টনক নড়ে সবার। তারমানে এই আগ্নেয়গিরির অতল গহ্বরের ভেতরেই রয়েছে ছোট ছোট কোন কীট ( ওয়েদার )। যেটা কিনা সাহায্য করছে আগ্নেয়গিরিকে মিথেন উদগীরন করতে!

বিশেষজ্ঞদের মতে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত এমন প্রায় ১০০০ টি শীতল আগ্নেয়গিরি রয়েছে পৃথিবীতে ( বিবিসি )। যারা বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে পানির নীচের এক অসাধারন বাস্তুসংস্থান। এক অনন্য জীব। যদিও এর থেকে উৎপন্ন মিথেনকে বিশ্বের বছরে উত্পন্ন মিথেনের ৫ শতাংশ মনে করা হয়, সেই তুলনায় এটি আমাদের প্রকৃতিকেও রাখছে অনেকটা সুন্দর আর অকৃত্রিম। আর তাই বিশ্বায়নের এই যুগে নানারকম ক্ষতিকর মানুষসৃষ্ট প্রভাবের হাত থেকে একটু হলেও আমাদের এই শীতল আগ্নেয়গিরিগুলোকে বাঁচানোর কথা ভাবা উচিত।






মন্তব্য চালু নেই