মেইন ম্যেনু

সিনেমাকেও হার মানায় মোহাম্মদ আলীর ‘প্রেমের গল্প’

মোহাম্মদ আলী, বিশ্বজুড়ে শুধু এক বিখ্যাত আমেরিকান মুষ্টিযোদ্ধার নামই নয় খেলার বাইরে এক অসাধারণ মানুষের নাম।

জন্মগত নাম ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র। ১৯৬৪ সালে পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে সর্বকালের সেরা বক্সার ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর নিজের বাবা মা’র দেয়া নাম কে পরিবর্তন করে রাখেন মোহাম্মদ আলী।

মার্কিন পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন, সাধারণভাবে যাকে ক্রীড়ার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেভিওয়েট হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। ক্রীড়াজীবনের শুরুর দিকে আলী রিংয়ের ভেতরে ও বাইরে একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ও বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড তাকে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় ও বিবিসি তাকে শতাব্দীর সেরা ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত করেছে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক তিনবারের বক্সিং হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদের প্রেমর গল্প:

সালটা ছিলো ১৯৯২।লুইভেলের অভিজাত কাফে। এক সুন্দরী মহিলার প্রবেশ এবং তৎক্ষণাৎচোখমুখই পাল্টে যাওয়া মোহাম্মদ আলীর। তিনবারের বক্সিং হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নকে সেই মহিলা এবার নিভৃতে নিয়ে চলে গেলেন। জনবহুল কাফের মধ্যেই চলতে থাকল তাদের প্রেম।

মোহাম্মদ আলীকে কেউ কখনও এভাবে ‘ফ্লার্ট’ করতে দেখেনি। প্রকাশ্য কাফেতে কাউকে ‘কিস’ করার চেষ্টা করছেন তিনি? নাহ্! সঙ্গিনী তখন তার বাহুবন্দি। তরুণীর মুখ লাল হয়ে উঠছে লজ্জায়।

সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারছেন না। কখনও মোহাম্মদ আলী তার গালে চুম্বন করছেন, কখনও কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলছেন। যেন বাকি বিশ্ব তাদের এই প্রকাশ্য প্রেম দেখে কী বলল না বলল, তাতে কিছু এসেই যায় না ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ এর!

গত ৩ জুন ৭৪ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ।

মোহাম্মদ আলী যার সঙ্গে প্রকাশ্য প্রেমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, তার নাম লনি উইলিয়ামস। ততদিনে আলীকে বিয়ে করে লনি আলী হয়ে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন মোহাম্মদ আলীর চতুর্থ স্ত্রী । লনির মতো কেউ আসেননি তার জীবনে।

তার বন্ধুদের মতে, তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবনে লনি যেভাবে পারকিনসন‌্সে আক্রান্ত স্বামীকে আগলে রেখেছিলেন, অবিশ্বাস্য! শুধু আদর্শ প্রেমিকার ভূমিকাই তিনি পালন করেননি। এমবিএ করার সুবাদে স্বামীর আর্থিক অবস্থাকেও সুদক্ষ হাতে সামলেছেন তিন দশকের ওপর।

যে কারণে দীর্ঘ রোগে ভুগলেও কখনও আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়তে হয়নি মোহাম্মদ আলীর পরিবারকে। না হলে ১৯৮৬ তে দের যখন বিয়ে হয়, আলির কোষাগারে মন্দা আসতে শুরু করে দিয়েছে। কাফের প্রেম আসলে ঘটেছিল বিয়ের ছ’বছর পরে।

আলির চিরবিদায় অনুষ্ঠানের আগে র‌্যামসে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলেছেন, ‘সেই দৃশ্যটা দেখে আমার হৃদয়ও উষ্ণতায় ভরে গিয়েছিল। সেদিন প্রথম দেখেছিলাম, মুহাম্মদ আলি শুধু চ্যাম্পিয়ন বক্সারই ছিলেন না, শুধু মানবিকতাই দেখাতে পারতেন না, তিনি গভীর প্রেম প্রদর্শনেও সপ্রতিভ।’

র‌্যামসে এও জানিয়েছেন যে, তখনকার দিনেও ট্যাবলয়েডের চোখকে ফাঁকি দিয়ে দিব্যি প্রেম করেছেন দু’জনে। এ ব্যাপারে আলী এবং লনি বেশ ডাকাবুকো ছিলেন।

দু’জনের প্রেমকাহিনিতে ফিল্মের মশলার অভাব ছিল না। প্রথম দু’জনের দেখা হয় ১৯৬৩-তে। আলি তখন দামাল এক তরুণ। সদ্য সামার অলিম্পিক্সে সোনা জিতে বাবা-মাকে নতুন বাড়ি কিনে দিয়েছেন।

লনিও তার পরিবারও বাসস্থান পাল্টে সেই এলাকায় চলে আসে। লনির মা মার্গারেট উইলিয়ামস এবং মোহাম্মদ আলীর মা ওডেসা দ্রুতই খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেলেন।

মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেই এলাকার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করতেন মোহাম্মদ আলী। এরকমই একটি মুহূর্তে তিনি প্রথম দেখেন লনিকে। ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ তখন ২১। আর লনির বয়স? ৬!

আলির ব্যক্তিগত জীবন এরপর আপন ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে। তিনটি বিয়ে করেন তিনি। ১৯৬৪ সালে সঁজি রয়কে বিয়ে করেন। সঁজি ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী।

তিন বছর পরে বেলিন্ডা বয়েডকে বিয়ে করেন। আলি এবং বেলিন্ডার চার সন্তান। ১৯৭৭ সালে ভেরোনিকা পাশ হন তার তৃতীয় স্ত্রী। তাদের দু’জনের দু’টি সন্তান।

‘দ্য গ্রেটেস্ট’ জীবনে সেরা নারী কে, এই প্রশ্ন উঠলে চোখ বন্ধ করে তার বন্ধুরা লনি নামই বলেন সবার আগে । কিশোর বয়সে লনির কাছে মোহাম্মদ আলি ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো। কখনও-সখনও প্রেম নিয়েও উপদেশ দিতেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠতে থাকা বক্সার।

এমনও বলতেন তাকে যে, কখনও কোনও অ্যাথলিটের সঙ্গে প্রেম করবে না। ওরা তোমার সঙ্গে ঠিকমতো আচরণ করবে না। ১৭ বছর বয়সে এসে লনির মনে আর কোনও দ্বিধা ছিল না।

ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি তখনই বলে দিয়েছিলেন, ‘‘আমি জানি, মোহাম্মদ আলীকেই বিয়ে করব।’ আর একবার আলির প্রতি তার টিনএজ বয়সের অনুভূতি নিয়ে বলতে গিয়ে লনি বলেছিলেন, ‘চোখ বন্ধ করলে দেখতে পেতাম, মাথার ওপর একটা ছাতা। যেন সমস্ত রোদ, জল, ঝড় থেকে আমাকে রক্ষা করতে চায়। আমি জানতাম সেই ছাতাটার নাম মোহাম্মদ আলীই।’

কে কার ছাতা ছিলেন? সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। স্কুলজীবনে লনির পড়াশুনোর ব্যাপারে আর্থিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতেও দ্বিধা করেননি তিনি। আবার পারকিনসন‌্সে আক্রান্ত মোহাম্মদ আলী যখন একাকী, ভীষণভাবেই তার দরকার হয়ে পড়েছে চব্বিশ ঘণ্টার সেবা এবং তদারকি, তখন নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে এলেন লনি।

শুধু ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাকে সমস্ত জায়গায় নিয়ে যাওয়া বা চলতে-ফিরতে সাহায্য করাই নয়, বুদ্ধিমতীর মতো প্রায় আর্থিক সংকট থেকে তৈরি করলেন নতুন এক আলী-সাম্রাজ্য।

সেই আর্থিক স্বচ্ছলতায় শুধু আলির চিকিৎসাই চলল না, চলল নানা সমাজসেবামূলক কাজ।

আলী হীন জীবন তার কাছে আলোহীন হয়ে পড়ার মতো। কীভাবে সামলাচ্ছেন? বন্ধুদের কাছে লনি বলেছেন, ‘যখন খুব দুঃখ হচ্ছে, বুকের ভিতরটা ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছে, বুঝতে পারছি চোখের পানি সমস্ত বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে, আলীর কন্ঠস্বর শুনতে পাই। যেন আমাকে বলছে, উঠে দাঁড়াও লনি। মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। কেঁদো না, লনি কেঁদো না।’

মোহাম্মদ আলী যার মধ্যে জীবন খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনি কি আর সহজে জীবনের যুদ্ধে হার মানবেন!






মন্তব্য চালু নেই