মেইন ম্যেনু

সিম ক্লোনিং : প্রয়োজন সতর্কতা

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই এখন সহজলভ্য। কঠিন অনেক বিষয় মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগও সহজ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত একজনের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগের এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে সেল ফোন বো মোবাইল ফোন।

এই মোবাইল ফোনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সিম (সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিফিকেশন মডিউল) কার্ড। মোবাইল অপারেটরের কাছ থেকে এই সিম কার্ড বা সিম নিতে হয়। আমরা যখন যেখানেই থাকি না কেন পারস্পরিক তাৎক্ষণিক যোগাযোগে এর বিকল্প নেই। কিন্তু কেউ যদি এর অপব্যবহার করে তাহলে তার পরিনতি হতে পারে মারাত্মক। আবার কারও অজান্তে তার মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে অন্য কেউ কোন অপরাধ করলে তার দায় প্রথমেই বর্তাবে সংশ্লিষ্ট নম্বর বা সিম যার নামে আছে তার ওপর।

এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে অন্যের সিম ব্যবহার করে ফোনে হুমকি দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর অপরাধীরা এটি করছে অন্য কারও সিম ক্লোন করে।

এখন যেকোনো সময় কারো সিম নম্বর ক্লোনিং হতে পারে। সেই সিম নম্বর দিয়ে কাউকে হত্যার হুমকি, চাঁদা চাওয়া, অশ্লীল মেসেজ পাঠানোসহ বিভিন্ন রকমের হয়রানি করতে পারে দুর্বৃত্তরা।

সিম ক্লোনিং হওয়ার বিষয়টি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কা করেছেন গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তারা আশঙ্কা করছেন, অচিরেই সিম ক্লোনিং ঠেকাতে না পারলে সমাজের মধ্যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি ভালো মানুষগুলোও আইনী হয়রানির স্বীকার হতে পারেন। তবে এসব বন্ধে গোয়েন্দা পুলিশ প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ সব ধরণের কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য যাদের সহায়তায় সিম ক্লোনিং করা হয় কিংবা যাদের কাছ থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার করা হয় তাদের খোঁজা হচ্ছে। এ চক্র বর্তমানে বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি সিম নম্বর ক্লোনিং করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকিসহ নানারকম অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর এ ধরণের আশঙ্কার কথা জানান গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (পূর্ব) মাহবুব আলম।

গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, সিম ক্লোনিং একটি সফটওয়ারের মাধ্যমে করা হয়। আইটি এক্সপার্টরাই একাজ করে থাকে। তবে কল করতে টাকার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে দুটি উপায়ে টাকা কাজে লাগায় অপরাধীরা। একটি হলো-ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে। আরেকটি হলো- যাদের সিমে সবসময় অধিক টাকা থাকে।

সিম ক্লোনিং করার সময় অপারেটর কোম্পানিগুলো কোনোভাবে জানতে পারে না। তবে তাদের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যোগাযোগ করছেন কিভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এটি রোধ করা যায়। এক্ষেত্রে সিম অপারেটর কোম্পানিগুলো সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে জনগনকেও সচেতনতার কথা বলেন গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, কারও সিম বন্ধ থাকলেও ওই সিমে যদি কল যায় তাহলে ধরে নিতে হবে, সেই সিম ক্লোন করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অপারেটর কোম্পানি ও নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে। অনেক সময় নিজের সিম নিজেই বন্ধ করে দেখতে হবে আসলে ওই সিমে কোনো কল যাচ্ছে কি-না।

সিম ক্লোনিংয়ের পর যার কাছ থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার করা হয় তাকে ধরতে এরই মধ্যে কয়েক দফায় অভিযান চালানো হয়েছে। যে বা যারা এর সঙ্গে জড়িত খুব শিগগির তাদের ধরা হবে। এ চক্রকে ধরতে পারলেই প্রকৃত সিম ক্লোনিং কিভাবে করা হয় তার উপায় জানা যাবে এবং তা বন্ধ হবে।

মুলত দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো কোণঠাসা হওয়ার কারণে তারা এসব পন্থা বেছে নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এসব সিম দিয়ে এরই মধ্যে তারা দেশের বিশিষ্ট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ এখন পর্যন্ত ১৫৩ ব্যক্তিকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তাছাড়া এসব সিম দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে একাধিক ব্লগার হত্যাকান্ডও ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

একটি সিম ক্লোন করা হয়েছে কি না এটি বোঝা যাবে যখন- যেটি আপনি ব্যবহার করছেন সেই সিম টি যদি অন্য কেউ ব্যবহার করে কিংবা এক নাম্বার যদি দেখেন এক সঙ্গে দুজন ব্যবহার করে। আবার হঠাৎ করে যদি দেখেন আপনার সেল ফোনের কানেকশন নাম্বার থেকে ব্যালান্স কোন কারন ছাড়া কমে যায়।

আপনি যদি অপরিচিত কোন নাম্বার থেকে মিসড কল পান এবং সেটাতে যদি কল ব্যাক করেন তবে আপনি সিম ক্লোনিংয়ের শিকারে পরিনত হতে পারেন। দুষ্কৃতকারীরা বিশেষ একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে আপনার নাম্বার ক্লোনিং করে। অর্থাৎ আপনি যখন মিসড কল নাম্বারে কল ব্যাক করবেন তখন একটি সফটওয়্যার এর মাধ্যমে আপনার নাম্বার ক্লোন হতে পারে। সিম ক্লোনিং হলে আপনার সিমে রাখা ডাটা ক্লোন নাম্বারে চলে যাবে। এতে আপনার প্রাইভেসি ক্ষুণ্ণ হবে।

সাধারনত জঙ্গি কিংবা দুষ্কৃতিকারীরা আপনার নাম্বার টি ব্যবহার করে আপনার জীবন বিপন্ন করতে পারে। অর্থাৎ ওই নাম্বার দিয়ে কেউ কাউকে মৃত্যুর হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা জঙ্গি কানেকশন করলে আপাত তার দায়ভার আপনার ওপর বর্তাবে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনাকে ধরবে। এছাড়া আরও নানা সমস্যায় পড়তে পারেন।

সুতরাং অপরিচিত নাম্বার থেকে মিসড কল এলে আপনি কল ব্যাক করার পূর্বে ভালো করে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করুন যে এটি কার নাম্বার। অথবা কল ব্যাক করা বন্ধ করুন। মনে রাখতে হবে সিম ক্লোনিং হতে হলে মিসড কল আসবে। সরাসরি রিং হলে সেটি রিসিভ করলে আপনি সিম ক্লোনিংয়ের শিকার হবেন না। তাই মিসড কল এলেই সতর্ক হতে হবে।

যদি দেখেন আপনার সেল ফোনের ব্যালান্স অকারণে কমে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে কল সেন্টারে ফোন করে জানান। এছাড়া আপনার সেল ফোন বন্ধ করে অন্য একটি নাম্বার থেকে আপনার নাম্বারে ফোন দিন। দেখুন রিং হয় কিনা। রিং হলে বুঝতে হবে আপনার সিম কেউ ক্লোন করেছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, অপরাধীরা প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। সিম ক্লোনিং পদ্ধতিও তার মধ্যে একটি। অপরাধীরা যেভাবে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কৌশল পাল্টাচ্ছে, ঠিক তার চেয়ে দ্রুত গতিতে এদেশের জননিরাপত্তা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে এগিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে রয়েছে। অপরাধীদেরও আগে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থাকা দরকার ছিল। একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা উপায় খোঁজার চেষ্টা করি।

সিম ক্লোনিং অচিরেই যেকোনো উপায়ে বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। নাহলে সমাজে অপরাধের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে। আর অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে।






মন্তব্য চালু নেই