মেইন ম্যেনু

‘সীমান্ত পার হলেও নিরস্ত্রকে গুলি চালানো যাবে না’

বৈধ কাগজপত্র ছাড়া এক দেশ থেকে অন্য দেশে গেলে অর্থাৎ অনুপ্রবেশ করলে আইনের চোখে সেটা অপরাধ। আইনে তার শাস্তির বিধানও আছে। কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় কেউ সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করলে তাকে কোনো ভাবেই গুলি করে মেরে ফেলা যায় না বলে রায় দিয়েছে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানির মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে গিয়ে পর্যবেক্ষণে কমিশন এ কথা জানিয়েছে বলে আনন্দবাজার পত্রিকা খবরে জানা গেছে।

সাড়ে চার বছর আগে কোচবিহারের চৌধুরীহাট সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা যান বাংলাদেশের কিশোরী ফেলানি। দীর্ঘ আইনি লড়াই চালায় তার পরিবার। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ছ’মাসের মধ্যে ফেলানির পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ লক্ষ টাকা তুলে দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া কী ভাবে এগোচ্ছে, ছ’সপ্তাহের মধ্যে সেই কাগজপত্র কমিশনের কাছে পেশ করতে হবে মন্ত্রণালয়কে।

ফেলানি-হত্যা মামলা নিয়ে দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে দীর্ঘ চাপান-উতোর চলে। ভারতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি সূত্রের খবর, বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিরাজুর রহমান এই ব্যাপারে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তারা ২০১৪ সালের অাগস্টেই ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছিলো। কিন্তু সেই সুপারিশপত্র পেয়ে কমিশনের কাছে বিএসএফের একটি রিপোর্ট পাঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়।

বিএসএফ’র ডিরেক্টর জেনারেলের পাঠানো সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, ফেলানি তার পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বেআইনি ভাবে ভারতে বসবাস করছিলো। সে পরিচারিকার কাজ করতো দিল্লিতে। বাংলাদেশে তার বিয়ে ঠিক হওয়ায় ২০১১ সালের জানুয়ারিতে বাবা ও মামার সঙ্গে সে বেআইনি ভাবেই সীমান্ত পেরোতে গিয়েছিলো। বাবা ও মামা ও-পারে ঢুকে পড়েন। তারপরে ফেলানি বেড়া টপকাতে যায়। তাকে আইন ভেঙে সীমান্ত পেরোতে দেখেই বিএসএফ গুলি চালায়। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ দিলে অনুপ্রবেশে মদত দেয়া হচ্ছে বলে সমাজের কাছে ভুল বার্তা যাবে। সীমান্তরক্ষীদের মনোবলও ধাক্কা খাবে বলে কমিশনের কাছে পাঠানো রিপোর্টে যুক্তি দেখিয়েছিলেন তিনি।

বিএসএফ’র সেই রিপোর্ট খারিজ করে মানবাধিকার কমিশন সম্প্রতি জানিয়ে দেয়, কোনোভাবেই নিরস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করা যায় না। খোদ বিএসএফ-কর্তৃপক্ষ ২০০৫-এ নির্দেশিকা জারি করে বলেছিলেন, কেউ অস্ত্র-সহ অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে তবেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। নিরস্ত্র অবস্থায় কোনো মহিলা বা শিশু সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করলে তাকে আটক করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে রোখার জন্য কোনো মতেই গুলি ছোড়া যাবে না।

ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, ফেলানির ক্ষেত্রে বিএসএফ-কর্তৃপক্ষের সেই নির্দেশিকা মানা হয়নি। ওই কিশোরী সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিলো ঠিকই। কিন্তু তার কাছে কোনো অস্ত্র ছিলো না। তা সত্ত্বেও অমিয় ঘোষ নামে বিএসএফের এক কনস্টেবল তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন এবং তিনি মোটেই আত্মরক্ষার তাগিদে গুলি ছোড়েননি। কারণ, ফেলানির দিক থেকে সশস্ত্র আক্রমণের কোনো আশঙ্কাই ছিলো না। নিতান্ত নিরস্ত্র অবস্থায় কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর সময়েই তার গায়ে গুলি লাগে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেও মেয়েটির দেহ সেই বেড়ায় ঝুলেছিলো।

ঘটনার পরে অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে ‘জেনারেল সিকিওরিটি ফোর্স কোর্ট’-এ বিচার শুরু করেন বিএসএফ-কর্তৃপক্ষ। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে সেই বিশেষ আদালত অমিয়কে নির্দোষ বলে ঘোষণা করে। ফেলানির পরিবার তা মানতে চায়নি। তাই নতুন করে বিচারের ব্যবস্থা হয় গত জুলাইয়ে। কিন্তু সেখানেও কনস্টেবলকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে আগের রায় বহাল রাখা হয়।

ভারত-বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী এবং অন্যান্য সংগঠন সেই রায় মেনে নিতে পারেননি। তাই বিশেষ আদালতের দ্বিতীয় রায়ের পরে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ভারতের জাতীয় কমিশনের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন।

ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, ফেলানিকে নিরস্ত্র অবস্থায় যেভাবে মারা হয়েছে, তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এমন ক্ষেত্রে গুলি না চালিয়ে অভিযুক্তকে রোখার চেষ্টা করা বা তাকে আটক করা যেতে পারে। তাতে অনুপ্রবেশকে কোনো ভাবেই মদত দেয়া হয় না। ফেলানির ক্ষেত্রে প্রথমে সুপারিশের আকারেই ক্ষতিপূরণের কথা বলেছিলো কমিশন। এ বার তারা জানিয়েছে, সময়সীমার মধ্যে ওই টাকা দিতেই হবে মেয়েটির পরিবারের হাতে।






মন্তব্য চালু নেই