মেইন ম্যেনু

সেলফি তোলা কি মানসিক কোন রোগের লক্ষণ?

মানুষ নিজেকে দেখতে ভালোবাসে, নিজেকে অন্যের কাছে তুলে ধরতে ভালবাসে। নিজেই নানান ভঙ্গিতে নিজের ছবি তোলা একটি সাধারণ ঘটনা তাই। কিন্তু ছবি তোলার এই ধরণটি ততদিন পর্দার আড়ালেই ছিল যতদিন না ‘সেলফি’ বলে একটি শব্দ দিয়ে একে পরিচিত করে তোলা হল। সেলফি তোলা এখন ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসের মত। কিশোর তরুণ থেকে শুরু করে মাঝবয়সী মানুষটিও এখন তাঁর মোবাইলের ছোট ডিভাইসটির উপর বিশেষ মনোযোগী। ছবি তুলছেন, আবার সেটিকে এডিট করছেন, ফেসবুকে দিচ্ছেন আবার গুণে চলেছেন কয়টি লাইক পড়ল, কে কী কমেন্ট করল।

মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের এই নিজের প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগী হওয়াকে মানসিক রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তারা দেখেছেন, অনেক বাবা মা তাদের কিশোর সন্তানকে নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন, কারণ তাদের সন্তান সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে, ছবি তোলে নিজের এবং দিনের অগুণতি সময় ব্যয় করে সেই ছবি তোলা, আপলোড করাসহ নানান বিষয়ে।

আমাদের দেশে সন্তানকে নিয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া তেমন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বাবা মা এরা বরং সঙ্কোচ বোধ করবেন, সন্তানকে গালমন্দ করবেন, মোবাইল বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের উপর নজরদারি করবেন, কিন্তু কোনভাবেই তাকে চিকিৎসা করানো উচিৎ কিনা, সেই চিন্তা করবেন না। মিলিয়ে দেখুন এই লক্ষণগুলো। নিজের সাথে এবং যখন আপনি বাবা-মা, তখন সন্তানের সাথে। ভেবে দেখুন, ভাবা জরুরী কিনা!

১। মনোযোগ বিচ্যুতি
ধরুন, আপনার সন্তান একটি ভাল সেলফি পাওয়ার জন্য একের পর এক সেলফি তুলছে। সেই সময় পড়াশোনা বা অন্য কোন কাজ করতে দিলে সে মনোযোগের সাথে করতে পারছে কি? হয়তো কাজটি খুবই সাধারণ। আপনি তাকে এক গ্লাস পানি আনতে বললেন। কিন্তু মোবাইলে ছবি এডিট করতে সে এতই ব্যস্ত যে গ্লাসে পানি ঢালার বদলে টেবিলে পানি ফেলে দিল! পড়তে বসেও হয়তো পড়া বাদ দিয়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে যাচ্ছে সে। অথচ সময় যে চলে যাচ্ছে, সেদিকে কোন খেয়াল নেই। এর কোনটাই কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ নয়।

২। বিরক্ত বোধ করা
আপনি হয়ত সাধারণ একটি কাজের কথা বলছেন অথবা শুধু প্রশ্ন করেছেন আজ দিন কেমন গেল! আপনার সন্তান এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর না দিয়ে বরং উলটো বিরক্ত হয়ে গেল। রাগারাগি না করে কোন ভাবেই মোবাইল রাখতে পারেন আপনি তাঁর হাত থেকে। রাতে খাবার জন্য ডাকছেন কিন্তু সে মোবাইলে ব্যস্ত। বার বার নিজের ছবিই দেখছে। নিজেকে ভালবাসা মন্দ নয়, কিন্তু খাওয়ার চেয়ে ছবির গুরুত্ব বেশী হলে সেটা আসলে নিজের প্রতি ভালবাসা নয়, বরং ছবি তোলার প্রতি আসক্তি, যা নিয়ে ২য়বার ভাবা প্রয়োজন।

৩। মন খারাপ
যে কোন মানুষেরই তো মন খারাপ হতে পারে। মন খারাপ করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। হ্যাঁ, অবশ্যই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু কারণটি স্বাভাবিক তো? আপনি অনেকগুলো সেলফি তুললেন, এত কষ্ট করে এডিট করে আপলোড করলেন, প্রোফাইলের ছবি পরিবর্তন করলেন, কিন্তু তেমন সাড়া পাচ্ছেন না। আপনার বন্ধুরা লাইক দিচ্ছে না তেমন, কমেন্ট ও পড়ছে না আশানুরূপ। তাই আপনার মন খারাপ! বিষয়টি স্বাভাবিক কি?

৪। গুরুত্ব
আপনার কাছে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি? বা যেখানেই আপনি যান সেখানে কোন কাজটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন? পারিবারিক আড্ডায়, বা কোন অনুষ্ঠানে আশপাশের মানুষকে সময় দেওয়াটা দরকারি নাকি সেলফি তোলা? আপনি গেলেন বন্ধুর বিয়েতে। বাসায় ফিরে মোবাইলে ছবি যখন দেখছেন, খেয়াল করুন তো কয়টা ছবি আপনার বন্ধুর আর কয়টা আপনার নিজের? ভ্রমণে গেছেন কোন অপূর্ব সুন্দর জায়গায়। কী করছেন? চারপাশে তাকিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করছেন নাকি সেলফি তুলে যাচ্ছেন? আবার আপলোড দেওয়ার নেটওয়ার্ক নেই বলে বিরক্তও বোধ করছেন।

৫। নার্সিজম
অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিকতা যে মানসিক ব্যাধির জন্ম দেয় তার নাম নার্সিজম। এই ব্যাধিগ্রস্থ মানুষেরা নানান ভাবে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরে যাতে সে অন্যের মনোযোগ পেতে পারে। তাদের মানসিক অবস্থা থাকে এমন যে, “আমি অন্যদের চেয়ে বেশী যোগ্য এবং আমি সেটা সুযোগ পেলেই তুলে ধরব”। এজন্য তারা অদ্ভুত নানান কান্ড করতেও পিছ-পা হন না। আপনার আচরণগুলো এর সাথে মিলে যাচ্ছে না তো? আপনি যখন মা বা বাবা সন্তানের প্রতিও খেয়াল করুন, মিলিয়ে দেখুন তাঁর আচরণ গুলোকে।

মানুষের মনস্তত্ত্ব অনেক জটিল। আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনের গঠন অনেক দূর্বোধ্য। কিন্তু এই মস্তিষ্ক খাটিয়ে যেমন অনেক দারুণ বস্তু আবিষ্কার করা সম্ভব তেমনি মাথা না খাটানোর মত স্রোতে গা ভাসানো কাজও করা সম্ভব। আবার সেখান থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনাও সম্ভব। সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।






মন্তব্য চালু নেই