মেইন ম্যেনু

স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে যৌন সুড়সুড়ি বিষয়ক বই বিতরণ!

দেশের বিভিন্ন স্কুলের শিশুদের মাঝে যৌনতায় ভরা একটি বই বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে এই বই বিতরণ করায় বিব্রত অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে বলা হচ্ছে সচেতনতার জন্য ‘প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক বই’ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ‘নিজেকে জানো’ নামের এই বইয়ের লেখায় রয়েছে যৌন বিষয়ে রগরগে বর্ণনা। এ নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্ত ২৩ জুলাই এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক বই ‘নিজেকে জানো’ বিতরণ করেন স্কুলেরই শিক্ষকরা। এই বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে রয়েছে যৌন বিষয়ে কুরুচিপূর্ণ ও রগরগে বর্ণনা। নারী-পুরুষের গোপন অঙ্গের খোলামেলা বিবরণ, যৌনমিলনের বিভিন্ন পর্যায়, যৌনমিলন কেন, কিভাবে এসব বিষয়ের উপর বইটি লেখা হয়েছে।

বইটির ‘‘শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন’’ অধ্যায়ে লেখা আছে, ‘…যখন একটি মেয়ে ১০-১২ বছর বয়সে পৌছে, তখন তার শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়। যেমন- উচ্চতা বাড়ে, মাসিক শুরু হয়, স্তন বড় হয়, বগলে ও যৌনাঙ্গে চুল বা লোম গজায়। এই পরিবর্তনগুলিই হচ্ছে মেয়েদের বড় হওয়ার লক্ষণ। মাসিক একটি মেয়ের শারীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণত ১০-১৩ বছর হওয়ার পর শুরু হয় এবং স্বাভাবিক নিয়েমে ৪৫-৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। মাসিক স্রাব শুরু হওয়ার প্রথম বছগেুলোতে কিছুটা অনিয়ম হতে পারে এবং তলপেটে ব্যথা হতে পারে। যদিও এ বয়স থেকেই মেয়েরা গর্ভবতী হতে পারে ,তবে ২০ বছরের আগে শারীরিক বৃদ্ধি পুরোপুরি না হওয়ার কারণে সন্তান ধারণ করা উচিত নয়।

মেয়েদের মতো ছেলেরা যখন বড় হতে থাকে তাদেরও বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন- উচ্চতা বাড়তে থাকে, কাঁধ চওড়া হয় এবং শরীরের মাংসপেসী শক্ত হতে থাকে। ছেলেরা বড় হচ্ছে তার আরও লক্ষন হলো দাড়ি-গোফ গজানো ও গলার স্বরের পরিবর্তন। এ বয়সে ছেলেদের শরীরে শুক্রানুযুক্ত রস মাঝে মধ্যে মূত্রনালী দিয়ে বের হয়ে আসে, যাকে “ স্বপ্নদোষ ” বলা হয়। এই শুক্রানুই সন্তান জন্মদানের বীজ। স্বপ্নদোষ আসলে দোষের কিছু নয় বরং এটা ছেলেদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ক্ষমতা অর্জনের লক্ষণ।…’’

বইটির ‘‘বন্ধুত্ব ও ভালবাসা’’ শীর্ষক অধ্যায়ে একটি শিরোনাম হলো ‘প্রেম করলে কেন ছেলেমেয়েরা ধরাধরি করে?’ এখানে লেখা হয়েছে- প্রেম এমন একটি সম্পর্ক যেখানে প্রেমিক প্রেমিকা দু’জনের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করে, এ অনুভব হতেই তারা পরস্পরের খুব কাছাকাছি পেতে চায় এবং এ কারণেই অনেক সময় তারা পরস্পরকে স্পর্শ করে। আসলে কোনো সমাজেই এটা ভালো চোখে দেখে না। কৈশোর হলো জীবন গড়ার সময়। এ বয়সে এসব করে তাই সময় নষ্ট না করাই ভালো।

এ অধ্যায়ে আরেকটি শিরোনাম হলো, ‘পরিস্থিতির চাপে যদি দৈহিক মিলনের সম্ভাবনা দেখা দেয় তবে আমি সে অবস্থায় কী করবো?’ এখানে লেখা হয়েছে, বিয়ের আগে ছেলেমেয়েদের দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরা পরিস্থিতির চাপে এরকম অবস্থায় পড়তে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, আবেগকে ‘না’ বলতে জানাটাও বড় হওয়ার একটা লক্ষণ। পরিচয়ের একপর্যায়ে দৈহিন সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। যদি কারো মনে হয় যে তার প্রেমিক এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী, তবে মেয়েটাকে এ প্রস্তাবে সায় না দিয়ে বড় কারো সাথে বিষয়টি আলোচনা করা ভালো। যদি তা না করা যায় আর দৈহিক সম্পর্ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তবে গর্ভধারণ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কোনো অস্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার করা জরুরি। এরপরও যদি কোনো সমস্যা হয় তবে উপদেশের জন্য তুমি কাছের কোনো কিনিকে যেতে পারো। (বইটির শেষে বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত বেশ কয়েকটি কিনিক/সেবা সংস্থার তালিকা দেয়া রয়েছে এ সংক্রান্ত সেবা গ্রহণের জন্য)।

বইটির এ অধ্যায়ে আরো লেখা হয়েছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অন্য কোনো কারণে দৈহিক মিলনের ফলে একটি মেয়ের পেটে বাচ্চা আসতে পারে। তাই বিয়ের আগে দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি পেটে বাচ্চা এসে যায়, তবে দেরি না করে উপদেশের জন্য মা-বাবা অথবা কাছের কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। মা-বাবাকে যদি ব্যাপারটা বোঝানো না যায় আর মেয়েটিকে তারা গ্রহণ না করে, তাহলে কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার বা আত্মীয়ের পরামর্শ নেয়া ভালো।

‘নিজেকে জানো’ বইটির আরেকটি অধ্যায়ের নাম ‘দৈহিক সম্পর্ক’। এ অধ্যায়ের শুরুতে লেখা হয়েছে- নারী ও পুরুষের মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন খুবই স্বাভাবিক। তবে এতে সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলা অত্যাবশ্যক। অবৈধ যৌনমিলন তা যেকোনো বয়সেই হোক না কেন সেটা অনৈতিক ও সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। একমাত্র বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্কই বৈধ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।

‘বিয়ের আগে কেউ কেউ কনডম বা খাবার বড়ি ব্যবহার করে। সেটা কি ঠিক?’ শীর্ষক শিরোনামে লেখা হয়েছে এ দু’টি জন্ম নিরোধক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।

দৈহিক মিলন অধ্যায়ের আরেকটি শিরোনাম হলো ‘অনেকের সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে তা ক্ষতিকর। এরকম হলে কিভাবে নিরাপদ থাকা যায়?’ এখানেও লেখা হয়েছে- অনেকের সাথে দৈহিক সম্পর্ক থাকলে কনডম ব্যবহার খুবই জরুরি।

বইটিতে যৌনমিলন অধ্যায় আলোচনার আগে কিভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছেলেমেয়েরা পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, সে আকর্ষণ এবং ভালোলাগা প্রকাশের উপায় কী সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া যৌন অনুভূতি প্রকাশের বিভিন্ন উপায় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বইটির পেছনে লেখা রয়েছে মহিলা ও শিশুবিষযক মন্ত্রণালয়। এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন অ্যান্ড উইমেন প্রকল্পের জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় মুদ্রিত। বইটি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি)। বইটি প্রণয়নে সহায়তা নেয়া হয়েছে এমন ১১টি সংস্থার নাম বইয়ের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে। বইটি কী পরিমাণ স্কুলে বিতরণ করা হয়েছে জানার জন্য বিসিসিপি অফিসে ফোন করা হলে এক কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে অফিসে আসতে হবে। তবে অনেক দিন ধরেই বইটি বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এনজিও সংস্থা তাদের কাছ থেকে এ বই নিয়ে বিভিন্নভাবে বিতরণ করেছে। বেসরকারি একটি সংস্থা সারা দেশে যাদের অনেক স্কুল রয়েছে তারাও এ বই তাদের স্কুলে বিতরণ করেছে বলে জানানো হয় বিসিসিপি অফিস থেকে।

এর আগে রাজধানীর একটি স্কুলে এ বই বিতরণ করার পর অষ্টম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী তার বাবার কাছে দেয় বইটি। বইটি পড়ে উদ্বিগ্ন বাবা এ বই আর তিনি তার সন্তানকে পড়তে দেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বই নিয়ে রীতিমতো বিব্রত এবং অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছেন অনেক অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ। প্রশ্ন উঠেছে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এ ধরনের বই বিতরণের উদ্দেশ্য নিয়ে। সরকারের কোন কর্তৃপক্ষ কী বিবেচনায় তা অনুমোদন করল? তা নিয়েও প্রশ্ন অভিভাবকদের।

স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতন করতে এই বই বিতরণ করা হলেও বইয়ের লেখার মান ও বর্ণনা প্রশ্নবিদ্ধ করছে এই কার্যক্রমকে। যৌন সুড়সুড়িমূলক এই বই বিতরণ না করতে অভিভাবকরা দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে জানা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কয়েকটি বইয়ের মধ্যে এটি একটি হচ্ছে নিজেকে জানো। অন্যান্য বইগুলো হচ্ছে “বয়ঃসন্ধিকাল”, “বিয়ে এবং পারিবারিক স্বাস্থ্য” এবং “যৌনরোগ ও এইচআইভি/এইডস”। ইউএসএআইডি’র আর্থিক সহায়তায় এআরএইচ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১১টি সংস্থার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস্ বইটি প্রনয়ন করেছে। ১১টি সংস্থা হলো- বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস্ (বিসিসিপি), বাংলাদেশ রুরাল এডভান্সমেন্ট কমিটি (ব্রাক), বিসিসি ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, ফ্যামিলি হেল্থ রিসার্চ প্রজেক্ট, আইসিডিডিআর-বি, ফোকাস অন ইয়ং এডাল্টস্, এনজিও সার্ভিস ডেলিভারী প্রোগ্রাম ( এনএসডিপি), মেরী স্টোপস ক্লিনিক সোসাইটি, সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানী (এমএসসি), ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএসএআইডি।






মন্তব্য চালু নেই