মেইন ম্যেনু

স্পেনের রাস্তায় টমেটো উৎসবের ইতিহাস-ঐতিহ্য

‘লা টমাটিনা’ বা টমেটো উৎসব স্প্যানিশদের প্রাণের উৎসব। গতকাল মহা আড়ম্বরের সাথে স্প্যানিশরা পালন করল এই উৎসব। এটি ছিলো স্প্যানিশদের ৭০তম ‘লা টমাটিনা উৎসব। এ বছর প্রায় ২০০০০ এরও বেশি মানুষ রাস্তায় জমায়েত হয়েছিলো এই উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য।

স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা বুনিয়ল শহরে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে জন্য প্রতিবছর আগস্টের শেষ সপ্তাহজুড়ে চলে সাংস্কৃতিক উৎসব। আর এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হচ্ছে টমেটোর লড়াই। এ সময় স্পেনের বুনোলের অলিগলি পরিণত হয় লাল গালিচায়।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে ১৯৪৫ সালে উৎসবের শুরু হয় বুনিয়ল শহরের টাউনহলের এক কর্মকর্তার সাথে বিবাদের মাধ্যমে। এ কর্মকর্তার সাথে শহরের লোকেরা টমেটো ছুড়ে প্রতিবাদ জানায়। এরপর অনেকেই বিষয়টিকে মজার মনে করেন। আর তাই এর ধারাবাহিকতায় শুরু হয় টমেটো নিয়ে মজা করার এ আয়োজন।

বর্তমানে এই উৎসব স্পেনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আর ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে প্রতিবছর মেতে উঠে নানা বয়সী হাজার হাজার মানুষ। এখন কেবল স্পেন নয়, বিশ্বের অন্যতম মজার উৎসবে পরিণত হয়েছে এটি। প্রতিবছর অগাস্টের এই সময়টাতে দেশ বিদেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে যায় স্পেনে।

শুরুতে যে টমেটো ছুড়ে প্রতিবাদ করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কথিত আছে টমেটোবোঝাই একটি লরি রাস্তায় কাত হয়ে পড়ে গেলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে ওই টমেটো লড়াই শুরু হয়েছিল; কিন্তু একটা বিষয়ে সবাই একমত, শহরের কোতোয়াল এসেই লড়াই থামিয়েছিল এবং পরের বছর শহরবাসী এই লড়াইয়ে উৎসাহী ছিল।

লা টমাটিনার এই জমজমাট অবস্থা অবশ্য এক দিনে হয়নি। শুরুর দিকে লাগাতার কয়েক বছর চলে এই টমেটো খেলার ঘটনা। টমেটো খেলার অপরাধে বহু মানুষকে আটক করে জেলে ঢুকায় শহর কর্তৃপকক্ষ। কিন্তু কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর উৎসব চালু করার পর জনমত গঠনে এক ব্যঙ্গাত্মক কর্মসূচি হাতে নেয় শহরের মানুষেরা।

১৯৫৭ সালে লোকজন একটা কফিনের মধ্যে বিশাল একটা টমেটো রেখে ‘টমেটোর মৃত্যুতে’ শোক মিছিল করে। শোকসঙ্গীত গেয়ে গেয়ে পথচলা লোকে লোকারণ্য সেই মিছিল দেখেই শহর কর্তৃপরে টনক নড়ে। এরপর অনুমতি তো মেলেই, ধীরে ধীরে টাউন হলই এই টমেটো খেলার আনুষঙ্গিক আয়োজনের দায়িত্ব নিতে থাকে।

সকালে বুনিয়লের শহরকেন্দ্র প্লাজা ডেল পুয়েবলোয় এসে জড়ো হয় পাকা টমেটোভর্তি ট্রাকের সারি। শহরকেন্দ্রের চত্বরে রাখা থাকে দোতলা সমান উঁচু একটা গ্রিজ মাখানো কাঠের থাম। ওই থামের শিখরে একটা হ্যাম রাখা থাকে। হ্যাম এক প্রকার মাংসজাত খাবার। আনুষ্ঠানিকতা অনুযায়ী কোনো এক সাহসী প্রাণ ওই তৈলাক্ত থাম বেয়ে শিখর থেকে হ্যামটা জিতে না নেয়া পর্যন্ত এই টমেটো লড়াই শুরু হওয়ার কথা নয়; কিন্তু বাস্তবে তা কখনোই হয় না! বরং টাউন হল থেকে ছোড়া জলকামানের জলজ গম্ভীর গোলার শব্দের সাথে সাথেই শুরু হয় এই মহা হুল্লোড়।

অনেকটা হোলি খোলার মতোই চলে এই আয়োজন। আর তাই শুরুর পরই সবাই নিজেকে রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাগলামির মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় মাঝে মধ্যে। টমেটো তা যত পাকাই হোক, অন্যের দিকে ছুড়ে মারার আগে তা অবশ্যই হাতের চাপে চ্যাপটা করে নিতে হবে, যাতে কেউ ব্যথা না পায়। সাথে কোনো পানির বোতল বা গ্লাস আনা যাবে না। আর নারী বা পুরুষ কারো শার্ট, টি-শার্ট, জামা ছেঁড়া যাবে না; কিন্তু বাস্তবে লড়াইয়ের ময়দানে এই শেষ নিষেধটি কেউই যে মানেন না।

লড়াই শুরুর ঠিক এক ঘণ্টা পর আবারো শোনা যাবে জলকামানের গর্জন। আর তুনি শেষ লড়াই। এরপর আর কেউ কাউকে টমেটো নিয়ে তাড়া করতে পারবেন না বা নাজেহাল করতে পারবেন না। টমেটো লড়াই শেষের পর শুরু হয় আরেক যজ্ঞ। ১০০ টন পাকা টমেটোর রসে-রঙে পাল্টে যাওয়া শহর ধুয়েমুছে সাফ-সুতরো করার যজ্ঞ।

বুনিয়ল শহরের টমেটো উৎসব ‘লা টমাটিনা’ এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, দুনিয়ার নানা প্রান্তে ইতোমধ্যেই এই উৎসবের আদলে টমেটো উৎসবের প্রচলন হয়ে গেছে। -সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া ও এঅওল ।






মন্তব্য চালু নেই