মেইন ম্যেনু

২ নভেম্বর ঢাকায় আসছেন প্রতিনিধিদল

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিতে চায় মালয়েশিয়া

বহু নাটকীয়তার পর অবশেষে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক (৩ বছরে ১৫ লাখ) কর্মী মালয়েশিয়ায় নেওয়ার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাচ্ছে সিনারফ্ল্যাক্স নামে দেশটির একটি কোম্পানি। অনলাইন সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে ইতোমধ্যে একক কোম্পানি হিসেবে সিনারফ্লাক্সকে মালয়েশিয়া সরকার চূড়ান্ত করেছে বলে সম্প্রতি দেশটির একাধিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলমান ‘জি-টু-জি’ প্রক্রিয়া সংস্কার করে ‘জি-টু-জি প্লাস’ বা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারীভাবে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ইতোমধ্যে উভয় দেশের সরকার নীতিগত সিদ্ধান্তসহ সমঝোতা সইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আগামী ২ নভেম্বর মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ডিজির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তাদের বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে ‘জি-টু-জি প্লাস’ সমঝোতা সইয়ের সার্বিক দিকগুলো চূড়ান্ত হবে। এরপরই তা উভয় দেশের মন্ত্রিসভায় উত্থাপন ও পাস হওয়ার পর খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটি সঝোতা সই হবে।

কর্মী নেওয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে সিনারফ্লাক্স

বিগত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সিনারফ্লাক্স বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় তাদের অন-স্টপ-সার্ভিস সেন্টার খুলবে। বাংলাদেশে তাদের সার্ভিস সেন্টারে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে থাকবে— বায়ো-মেডিকেল পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন, উপস্থিতি ও যোগ্যতা নির্ণয়, ডাক্তারী পরীক্ষা। এছাড়া বাংলাদেশ ও মালয়েশীয় হাইকমিশনে বাংলাদেশী কর্মীদের থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহের পর ভিসা প্রসেসিংয়ের যাবতীয় কাজ সম্পাদন ও ভিসা স্টিকারযুক্ত পাসপোর্ট হাইকমিশন থেকে গ্রহণ করবে।

মালয়েশিয়ার দৈনিক পত্রিকা ‘মালয় মেইল অনলাইন’ গত ২১ অক্টোবর দেশটির স্বরাষ্ট্র ও উপ-প্রধানমন্ত্রী ড. আহমদ জাহিদ হামিদির বরাত দিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নিতে প্রসেস সার্ভিস প্রোভাইড বা অনলাইন ব্যবস্থাপনার জন্য মালয়েশিয়ান কোম্পানি সিনারফ্লাক্সকে(Synerflux) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ান ওই পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিনারফ্লাক্সকে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে চূড়ান্ত করার কারণ সম্পর্কে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে দুই দেশের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে কর্মী প্রেরণে তাদের (সিনারফ্লাক্স) প্রস্তাবিত নমুনা সবচাইতে কার্যকর, অধিকতর নিয়মতান্ত্রিক, ফলপ্রসূ এবং নিয়ন্ত্রিত।

সিনারফ্লাক্স গ্রুপের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ক্যাটারসিস ওভারসীজের মালিক রুহুল আমিন স্বপন বলেন, সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে সিনারফ্লাক্সকেই চূড়ান্ত করেছে মালয়েশিয়া সরকার।

তবে বায়রা সভাপতি আবুল বাশার অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা।

বুধবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, সিনারফ্লাক্সকে এখন পর্যন্ত ব্যবসার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এটা ভুয়া কথা।

হতাশায় বায়রার কার্যনির্বাহী কমিটি

গত জুন মাসে মালয়েশিয়া সরকারের কাছ থেকে তিন বছরে বেসরকারিভাবে ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা আসার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে পড়েন জনশক্তি ব্যবসায়ীরা। বায়রা সভাপতি আবুল বাশারের নেতৃত্বে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির জ্যেষ্ঠ ৫ নেতা মালয়েশিয়া সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখেন। তারা রিয়েল টাইম নামে মালয়েশিয়ান একটি কোম্পানিকে (মালয়েশীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাই) বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার সার্বিক দায়িত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন চিঠিতে। তবে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে রিয়েল টাইম-এর সার্ভিস প্রোভাইড প্রস্তাব পছন্দ না হওয়ায় একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশটির আরেক কোম্পানি সিনারফ্লাক্স এই কাজের জন্য চূড়ান্ত হয়।

আবুল বাশারসহ বায়রার কয়েকজন নেতা গণমাধ্যম কর্মীদের বলে আসছেন, সিনারফ্লাক্সের মালিক আমিন নুর ও বাংলাদেশে তার কিছু অনুসারী মিলে ‘সিন্ডিকেট’-এর মাধ্যমে শ্রমবাজারটি একচেটিয়া দখলে নিতে চাচ্ছে। এজন্য ক্যাটারসিস ওভারসিজের মালিক রুহুল আমিন স্বপনসহ কয়েকজনের নামও উল্লেখ করেন তারা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত রিয়েল টাইম বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার সার্ভিস প্রোভাইডারের দায়িত্ব না পাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে বায়রার কাযনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বায়রার এক কাযনির্বাহী কমিটির সদস্য বলেন, সভাপতি সাহেব আমাদের বলেছিলেন আমাদের সবাইকে নিয়েই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজ করবেন। কিন্তু, সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তিনি নাকি অন্য মাধ্যমে সিনারফ্লাক্স গ্রুপের সঙ্গে যোগসাজশ করছেন। বায়রার সহ-সভাপতিসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য স্বপন সাহেবদের সঙ্গে (ক্যাটারসিজ ওভারসীজের মালিক) লিয়াজোঁ রাখছেন। এখন আমরা কোথায় যাব।

এ ব্যাপারে আবুল বাশার বলেন, আমাদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা তৈরির জন্যই এ ধরনের কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে। আমার জানা মতে কেউ সিনারফ্লাক্স বা তাদের কারো সঙ্গে যোগসাজশ করেনি।

এ ব্যাপারে আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজীর আহমেদ বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে সবাই মিলেই ব্যবসা করবো। এখানে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। সিন্ডিকেটের কথা বলে বহু কাঙ্ক্ষিত এই শ্রমবাজারটি নষ্ট করা উচিত হবে না।

বায়রার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা সিনারফ্লাক্সের বিরুদ্ধে নানাভাবে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। তাদের অনেকেই আবার সিনারফ্লাক্সের লোকজনের সঙ্গে ব্যবসা করার সুযোগ চাচ্ছেন কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবাই তো চান ব্যবসা করতে। এক জায়গায় সফল না হলে অন্য জায়গায় কেউ যেতেই পারেন।

এ ব্যাপারে রুহুল আমিন স্বপন বলেন, সিনারফ্লাক্সকে কিসের ভিত্তিতে তারা সিন্ডিকেট বলছে তা বোধগম্য নয়। তাদের কাছে কি এ নিয়ে কোনো প্রমাণ আছে? কাগজপত্রে কোথাও এটা লেখা নাই। এসব বললে বাজারটা নষ্ট হবে, বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। দুই দেশের সরকার যে পলিসি করবে তাই ই আমাদের মেনে চলা উচিত।

নাম প্রকাশে একজন শীর্ষ জনশক্তি রফতানিকারক বলেন, ‘সিন্ডিকেট যদি বলতে হয় তাহলে বায়রার সভাপতি আবুল বাশারের নেতৃত্বে কয়েকজনই তা করেছিলেন। তারা তো রিয়েল টাইম নামে মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য সরাসরি চিঠি লিখেছিলেন। যখনই তারা দেখেছে যে, রিয়েল টাইম কাজ না পেয়ে অন্য একটি কোম্পানি পেয়েছে-তখন থেকেই তারা নানা বিভ্রান্তিমূলক কথাববার্তা বলতে শুরু করেছেন। এমনকি মালিয়েশিয়া সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পরিবারকে নিয়েও মানহানিকর বক্তব্য দিচ্ছেন। এটাতো ঠিক নয়। এতে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট হয়।

তবে আবুল বাশার বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন, তিনি কোনো কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য সরাসরি কোনো সুপারিশ করেননি।

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর নিশ্চয়তা চায় মালয়েশিয়া

সমুদ্রপথে মানবপাচার ইস্যুটি যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কঠোরভাবে সমালোচিত হচ্ছিল ঠিক তখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তের ঘোষণা আসে। এ নিয়ে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো জেগে ওঠে। মালয়েশিয়া সরকার চাচ্ছে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে। অতীতের মতো এ সেক্টরে যাতে ফের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, এর নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশের কাছে। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও চাচ্ছেন দ্রুত মালয়েশিয়ায় বড় পরিসরে এই বাজারটি উন্মুক্ত হোক। কিন্তু, দ্রুত বাজার উন্মুক্ত করতে গিয়ে যেন এ সেক্টরে বিশৃঙ্খলার পথ খোলা না থাকে তা-ও গুরুত্বসহকারে দেখছেন তিনি।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘মালয়েশিয়ার সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটি উন্মুক্তের জন্য মাননীয় মন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা আপ্রাণ কাজ করছি। এটি উন্মুক্ত হলে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের বেকারত্ব দূর হবে। আমাদের রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়বে। সুষ্ঠু ও যথাযথ পদ্ধতিতে যাতে বিপুল সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় আসতে পারে, তাদের সুযোগ সুবিধা যাতে নিশ্চিত হয়-সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি। বাজারটি উন্মুক্ত হলে সবাই মিলেই ব্যবসা করতে পারবেন। এ খাতে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি না হয়, সেভাবেই মাননীয় মন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এগুচ্ছি। মালয়েশিয়া সরকারও তাই চাচ্ছে।

কবে নাগাদ এ ব্যাপারে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা সই হচ্ছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দিনক্ষণ ঠিক করে কিছু বলতে চাই না। তবে অচিরেই আশার আলো জ্বলবে।’

এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার বুধবার রাতে বলেন, আগামী ২ নভেম্বর মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দলের সম্ভাব্য তারিখ রয়েছে। তাদের সঙ্গে বৈঠকে এমওইউ সইয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। এরপরেই বলা যাবে কবে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা সই হবে।দ্য রিপোর্ট






মন্তব্য চালু নেই