মেইন ম্যেনু

‘স্বামীকে পিঠে নিয়ে ওরা আমাকে দৌড়াতে বাধ্য করে’

ভারতের উদয়পুর থেকে ১৩০ কিমি দূরে নল কা গুড়া গ্রাম। সেখানে নিজের বাড়িতে অ্যাসবেস্টসের তলায় একটি খাটিয়াতে বসে শান্তা মিনা নিজের হাত ও দেহের বিভিন্ন অংশের কালশিটেগুলো দেখালেন। প্রায় দু’মাস আগে তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় ঘোড়ার মতো স্বামীকে পিঠে নিয়ে দু’-তিন কিলোমিটার দৌড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল ৷ তার আগে চলেছিল অকথ্য নির্যাতন। এত দিন কেটে গিয়েছে, তবু মানসিক ও শারীরিকভাবে চরম বিধ্বস্ত শান্তা।

সংবাদ সংস্থা টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে নিজের সেই দুঃস্বপ্নের দিনের কথা জানাতে গিয়ে শান্তা মিনা বলেন, এখনও তাঁর মনে হচ্ছে যে, তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকদের নোংরা হাতগুলি এখনও যেন তাঁর শরীরে আনাগোনা করছে। যে ব্যক্তি শান্তাকে সবার আগে সকলের সামনে বিবস্ত্র করেছিল, সে আর কেউ নয়, শান্তারই স্বামী ভানোয়ারলাল। শান্তার ‘অপরাধ’, স্বামীর সঙ্গে আর থাকতে না পেরে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করে তিনি আর এক ব্যক্তির সঙ্গে মিলিত হয়ে করছিলেন।

গত ১৪ জুন শান্তা তাঁর স্বামীকে ছেড়ে চলে যান। সেই সময়ে শান্তা মিনার পাশে ছিলেন তাঁর সেই০ সঙ্গী লালুরাম। কিন্তু গত ২০ জুন তাদের দুজনকেই কাসোটিয়া গ্রামে ধরেবেঁধে নিয়ে আসা হয়। তার পরই শুরু হয় বর্বর অত্যাচার। গ্রামের মোড়লদের অভিযোগ, তারা সহবাসে যাওয়ার আগে গ্রামের মোড়লদের জানায়নি কেন এবং ভানোয়ারলালকে আর্থিক ক্ষতিপূরণও বা দেয়নি কেন।

মিনা জনগোষ্ঠীর রীতি অনুযায়ী, যদি কোনও বিবাহিত পুরুষ বা মহিলা সংসার ছেড়ে অন্য কারও সঙ্গে থাকতে চায় তবে সেক্ষেত্রে গোষ্ঠীপতিদের আগাম জানাতে হবে এবং যাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এক্ষেত্রে শান্তা বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তাঁর স্বামী ভানোয়ারলালকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেননি। আর গ্রামের মোড়লদেরও জানাননি।

শান্তা কথায়, তিনি তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে পালিয়ে ভাতোয়াড় গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। তার ঠিক সপ্তাহখানেক বাদেই প্রায় ২৫-৩০ জন লোক মিলে ভাতোয়াড়ে গিয়ে তাঁদের আস্তানায় হামলা চালায়। বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে তাঁদের একটি টেম্পোয় তোলা হয়। তার পর সবাই মিলে তাঁদের উপর চেপে বসে।

শান্তা মিনা যখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন তখন স্টিরিওয় গান চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যাতে তাঁর সাহায্যের আকুতি অন্য কারও কানে না পৌঁছায়। টেম্পো কাসোটিয়া গ্রামে পৌঁছালে উপস্থিত জনতার মধ্যে থেকে কেউ আওয়াজ তোলে, ওদের ন্যাংটো করে দাও! সবার আগে সেই কাজে এগিয়ে আসে শান্তার স্বামী ভানোয়ারলাল। সে-ই তাঁকে সবার সামনে বিবস্ত্র করতে শুরু করে। তার পর উপস্থিত বাদবাকিরা হাত লাগায়।

শান্তার কথা অনুযায়ী, আতঙ্কে-অপমানে তিনি তখন চোখ বুজে ফেলেছিলেন। কারণ, শান্তার কথায়, তাঁর শরীরে যাদের নোংরা হাত ঘোরাফেরা করছিল, তারা কেউই বাইরের লোক নয়। গ্রাম এবং শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়। বহু দিন ধরে তিনি তাদের মামা’, ‘কাকা’ বলে ডেকেছেন। বলতে বলতে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে শান্তার।

শুধু বিবস্ত্র করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলে তাঁর স্পর্শকারতর স্থানে হাত দিতে ইতস্তত করেনি। তার পর ভানোয়ারলালকে ঘাড়ে নিয়ে শান্তাকে ঘোড়ার মতো প্রায় দু’-তিন কিলোমিটার দৌড়াতে বাধ্য করা হয়।

আরও দুঃখের, শান্তার সেদিনের সেই অপমানে মহিলারাও অংশ নিয়েছিলেন। কোলের শিশুদের দিয়েও তাঁরা তাঁকে কিল-চড়-ঘুসি মারিয়ে ছিলেন। এর পর শান্তা ও তাঁর সঙ্গী লালুরামকে গ্রামের মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় গাছে বেঁধে রাখা হয়। সেই অবস্থাতেই চলে তাঁদের ছবি তোলার পর্ব। পরে তাঁদের পিছমোড়া করে একটি ঘরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশেষে গত ২১ জুন লালুরামের পরিবার ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে উদ্ধার করে তাঁদের।

ঘটনার সূত্রে পুলিশ এখনও পর্যন্ত ২৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। আপাতত তারা জেল হেফাজতে। এখন নল কা গুড়া গ্রামে নিজের মায়ের সঙ্গেই বাস করছেন শান্তা। সরকারি সহায়তায় বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী জীবনটা কাটাতে চান তিনি। লালুরামের সঙ্গে আর গেলেন না কেন? ‘আনপড়’, ‘‘গাঁইয়া’ শান্তার স্পষ্ট জবাব, ‘‘স্বামীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েই ওর সঙ্গে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিনের গোটা ব্যাপারটা ও চুপচাপ দেখল, এতটুকু প্রতিবাদ করল না৷ সুতরাং, দ্বিতীয়বারেও যে প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতাই হবে না, তা কে বলতে পারে? তাই মায়ের সঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটাব বলে ঠিক করেছি।’’






মন্তব্য চালু নেই