মেইন ম্যেনু

স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ ॥ “রাগে কষ্টে তার গলায় তিনটা কোপ দিছি”

স্বামীর ‘গোপন বিয়ে’ নিয়ে আবু জাফর ও নূজাহান দম্পতির মধ্যে চলছিল কলহ। তবে সোমবার ভোররাতে সেহরির সময় দু’জন একই সঙ্গে খাবার খেয়ে রোজা রাখেন। এরপর ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েন জাফর। এই ‘সুযোগে’ স্বামীর ওপর এক ‘ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ’ নেন নূরজাহান! রান্নাঘর থেকে বটি এনে ঘুমন্ত জাফরের গলায় একে একে তিনটি কোপ বসিয়ে দেন তিনি। ঘুমে আচ্ছন্ন জাফর সামান্য শব্দ করেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তখন স্বামীর নিথর দেহটি টেনেহেঁচড়ে সিঁড়িতে ফেলে আসেন নূরজাহান। হত্যাকাণ্ডের এমন বর্ণনা অকপটে দিয়েছেন নূরজাহান নিজেই।

গত সোমবার ভোরে রাজধানীর কদমতলী থানার রায়েরবাগের মেরাজনগরের বি-ব্লকের নিচের বাড়ির সিঁড়ি থেকে ব্যবসায়ী আবু জাফরের (৪৫) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর হাকিম আশোক কুমার দত্তের আদালতে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন নিহতের প্রথম স্ত্রী নূরজাহান আক্তার।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম স্ত্রী নূরজাহানকে না জানিয়ে গোপনে পরকিয়া সম্পর্ক এবং দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে নূরজাহান দাবি করেছেন, তার স্বামী স্ত্রী হিসেবে তার কোনো অধিকারই পূরণ করছিলেন না। এ কারণে ক্ষুব্দ হয়েই তিনি রাগের মাথায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটান।

গত সোমবার লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ নূরজাহানকে আটক করে। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও হত্যার দায় স্বীকার করেন নূরজাহান। তিনি বলেন, ‘রাগে-কষ্টে তার গলায় তিনটা কোপ দিছি।’

কদমতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরশেদুল হক বলেন, ‘আলামত ও তদন্তের সূত্র ধরে স্ত্রী নূরজাহানকে আটক করার পরই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। সে স্বীকার করেছে- স্ত্রীর অধিকার না পেয়ে নিজেই স্বামীকে গলাকেটে হত্যা করেছে। মঙ্গলবার আদালতেও স্বীকারোক্তি দিয়েছে। আমরা তার ছেলেকে আটক করলেও পরে ছেড়ে দিয়েছি।’

কদমতলী থানায় হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আসলাম উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘মহানগর হাকিম আশোক কুমার দত্তের আদালতে হাজির করা হলে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন নূরজাহান। এরপরও হত্যায় তার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ আদালতের নির্দেশে নূরজাহানকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জবানবন্দীতে নূরহাজাহান স্বামীকে হত্যার দায় স্বীকার করলেও ঘটনার জন্য স্বামীর অনৈতিক সম্পর্ক ও অন্যায় আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ২২ বছর আগে জাফরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। প্রায় ১৫ বছর সিঙ্গাপুর ছিলেন জাফর। দীর্ঘদিন স্বামীর জন্য অপেক্ষা করলেও স্বামী দেশে ফিরে তার কোনো অধিকার ও চাহিদা পূরণ করেননি। বরং হালিমা বেগম নামে এক নারীর সঙ্গে পরোকীয় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন জাফর। এরপর গোপনে হালিমাকে বিয়েও করেন।

মেরাজনগরে বি-ব্লকে ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করেন জাফর। ওই এলাকায় তার আরো একটি টিনসেট বাড়ি আছে। এলাকায় ফিরে বাসার কাছে- ‘নুসরাত জেনারেল স্টোর’ একটি মুদি দোকান দেন জাফর। বিয়ে ও অনৈতিক চলাফেরার ব্যাপারে চাপ দিলে এসব সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করার হুমকি দেয়া হয়।

নূরজাহান বলেন, ‘হালিমার প্রথম স্বামী আব্দুল লতিফ প্রবাসী। দেশে ফিরলে জাফরকে দিয়ে হালিমাকে তালাক দেয়ান তিনি। কয়েক মাস আগে জাফর আবার হালিমাকে বিয়ে করে। মেরাজনগরের একটি বাসায় হালিমার সঙ্গে গোপনে মেলামেশাও করেন জাফর।’

বাজে আচরণের কারণে আরো একবার স্বামী জাফরকে ছুরিকঘাত করেছিলেন নূরজাহান। এসব বিষয়ে সমাধানের জন্য গত সোমবার একটি পারিবারিক বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।

হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে নূরজাহান বলেন, ‘রোববার রাতে স্ত্রীর অধিকার নিয়ে আমি জাফরের কাছে যাই। এ সময় জাফর আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তখন এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে ক্ষেপে যায় জাফর। ঝগড়ার একপর্যায়ে আমি পাশের কক্ষে চলে যাই।’

নূরজাহান জানান, ভোররাতে উঠে একসঙ্গে সেহরি খেলেও উত্তেজিত ছিলেন তিনি। প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন। সোমবার ভোর পৌনে ৫টার দিকে ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাতে যান জাফর। এ সময় রান্নাঘর থেকে বটি এনে তার গলায় আঘাত করেন নূরজাহান। তিনটি আঘাত করলেও প্রথম আঘাতেই বাম পাশের রগ কেটে অনেক রক্তক্ষরণ হয়। তখন সামান্য শব্দ করেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন জাফর।

এরপর তিনি জাফরের নিথর দেহটি বিছানা থেকে টেনেহেঁচড়ে বাইরে সিঁড়িতে নিয়ে যান। সেখানে জাফরকে ফেলে বাসায় ঢুকে বিছানার চাঁদর পরিবর্তন করেন তিনি। এরপর বাথরুমে গিয়ে বটি ধুঁয়ে পরিষ্কার করেন। পরে সিঁড়িতে জাফরকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে প্রতিবেশীরা চিৎকার করলে নূরজাহান বেরিয়ে আসেন। এ সময় তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।

জানা গেছে, গত সোমবার জাফরের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার বড়ভাই সিদ্দিকুর রহমান বাদি হয়ে কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। নিহত জাফর চাঁদপুরের হাজিগঞ্জের হানিফ খলিফার ছেলে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।






মন্তব্য চালু নেই