মেইন ম্যেনু

স্মৃতিতে অম্লান রাবির বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

ইয়াজিম ইসলাম পলাশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: চারদিকে নিস্তব্ধ। জনকোলাহল থেকে একটু দূরে অবস্থিত, ইতিহাসের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকা একটি জায়গা। নাম তার বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ। প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক এ বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ। যাতে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের ত্যাগ, নির্যাতিত মা-বোনের হাহাকার। আর স্বাক্ষী হয়ে আছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় সহচরদের নারকীয় গণহত্যা,নারী নির্যাতন, লুঠতরাজ ও অন্যান্য ধংসযজ্ঞের বিবরণ হিসেবে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় খোলা আকাশের নিচে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি নির্ভিক প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে এই বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি অবস্থিত। ১৬.১২.২০০০ তারিখে উপাচার্য এম সাইদুর রহমান এ বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর করেন। বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার অন্তর্ভুক্ত।

বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি সমতল ভূমি থেকে বেশ খানিকটা উঁচু করে বাঁধানো। চারদিকে হাজারো ফুলের অপরুপ শোভা আর গাছের পাতার সবুজ চাদরে মোড়ানো। তার ভেতরে একটি বড় কূপকে ঘিরে বানানো হয়েছে কংক্রিটের গোলাকার বেদি। কূপের গভীর থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৪২ ফুট উচ্চতার চৌকোনো ইটের স্তম্ভ। মনোরোম এই পরিবেশে দাঁড়িয়্ওে চোখের সামনে ফুঁটে উঠে মুক্তিযুদ্ধের এক টুকরো ইতিহাস। পাকিস্তানি মিলিটারি আর এদেশীয় দোসরদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সেই ভয়াল স্মৃতি।

দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষকে ধরে নিয়ে এসে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এখানে। তাদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার উদ্দেশ্যেই এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে তাদের ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। সেখানে রাজশাহীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে এসে অমানুষিক নির্যাতন করে।এই নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র,কর্মচারী এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যর্ওা । নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু সাঈদ, রাবির সংস্কৃত ভাষা বিভাগের সহকারী সহকারী অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার এবং মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মীর আব্দুল কাইয়ুমকে। এছাড়্ওা গণিত বিভাগের মুজিবর রহমান দেবদাস কাজী সালেহ, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. রাকিব , পরিসংখ্যান বিভাগের কাজী সালেহ, এবং বাংলা বিভাগের প্রভাষক ড.আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ অসংখ্য মানুষকে ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়।তাদের লালসার শিকার হয় অসংখ্য নারী। এই হলের পেছনে এক বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ছিলো বধ্যভূমি। এছাড়্ওা রাবি ্সংলগ্ন কাজলা এলাকা এবং রেল্ওয়ে স্টেশন এলাকায় প্ওায়া যায় আরো কয়েকটি গণকবর।

রাবির এই বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে প্রতিদিন শতাধিক দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে ঘুরতে এসেছেন মসজিদ মিশন একাডেমির একঝাঁক তরুণ শিক্ষার্থী। কথা হলো ঘুরতে আসা আসিফ ইকবালের সাথে। তিনি বললেন, সুযোগ পেয়েই ঘুরতে এসেছি। এসে খুবই ভালো লাগছে। পাঠ্যপুস্তকের বাইওে লাখো শহীদদের এ আত্মত্যাগের কথা সরাসরি জানতে পারছি। ঘুরতে এসে মনের ভেতর দেশপ্রেম জন্ম নিচ্ছে।

কথা হলো আরেক দর্শনার্থী পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বললেন ,মানসিক প্রশান্তির জন্য মাঝে মাঝেই এখানে ঘুরতে আসি। তবে এটা দেখে খারাপ লাগে যে অনেকেই জুতা পায়ে বেদিতে উঠে, অনেকে জন্মদিন পালন করতে এখানে আসে,হৈ হুল্লোর করে। মনে হয় তারা যেন শহীদদের আত্মত্যাগের কথা ভুলে গেছে। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। সত্যিই শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছি।






মন্তব্য চালু নেই