মেইন ম্যেনু

২০১৫ সালে ইন্টারনেটের যত ভুল!

চলে যাচ্ছে ২০১৫ সালটি। আরো একটি ব্যস্ত বছর পাড় করেলেন সাংবাদিকরা। নানা ঘটনা নিয়ে সরগরম ছিল সামাজিক মাধ্যমগুলোও। কিন্তু আপনারা জেনে অবাক হবেন, এ বছর ফেসবুক ও টুইটারে আলোচিত ছবিগুলোর বেশিরভাগই ছিল ভুল তথ্যে ভরা। এসব ছবি ও তথ্য তাই সাধারণ ইউজারদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছিল। কিছু কিছু ভুল তো ছিল আবার ইচ্ছাকৃত যা আপনি প্রতারনা হিসেবেও উল্লেখ করতে পারেন। এরকমই কিছু আলোচিত ছবি ও তথ্য নিয়ে বিবিসি’র আয়োজন ‘How the internet misled you in 2015’ সোজা বাংলায় যার অর্থ ‘২০১৫ সালে ইন্টারনেট যেভাবে আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে’। আসুন দেখে নেয়া যাক সেসব ভুল বা মিথ্যাচারগুলো।

o

নেপালের ভূমিকম্প
নেপালে এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যে ছবিটি গোটা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল সেটি আদতে নেপালেরই নয়। অথচ ছবিটির নিচে ক্যাপসনে জুড়ে দেয়া হয়েছিল, ‘নেপালে ভূমিকম্পের সময় যেভাবে আতঙ্কিত দু বছরের বোনকে আগলে রেখেছে চার বছরের ভাইটি।’ ভূমিকম্পে আক্রান্তদের জন্য দাতাদের কাছ থেকে ত্রাণ সহায়তার জন্য গোটা বছর জুড়ে ফেসবুক আর টুইটারে ঘুরে ফিরে এ ছবিটিই বার বার ব্যবহার করা হয়েছে। আদতে এটি নেপালের ছবি নয়-ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত এক গ্রামের ছবি যা নেয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে। ছবিটি তুলেছিলেন ভিয়েতনামের আলোকচিত্রী না সন নগুয়েন। ইন্টারনেটের এই ভুল সম্পর্কে তিনি দুঃখ করে বলেছেন,‘সম্ভবত ফেসবুকে এটিই আমার সবচেয়ে বেশি শেয়ার হওয়া ছবি। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া তথ্যটি ছিল মিথ্যা।’

ভূমিকম্প

নেপালের ভূমিকম্পের ওপর ও ফেসবুক ও ইউটিউবে যে ভিডিওটি শেয়ার হয়েছিল সেখানে একই ভুল দেখা গেছে। ভিডিওটি যে সুইমিংপুলটি দেখানো হয়েছে তা কাঠমান্ডুর এক হোটেলের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল মেক্সিকোর ভূমিকম্পের ভিডিও। এটি ধারণ করা হয়েছিল পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে। কিন্তু নেপালে ৮১ বছরে মধ্যে সবচাইতে ভয়াবহ ভূমিকম্পটির খবর প্রচার করার সময় বারবার আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো এটি ব্যবহার করেছে।

এ নিয়ে ইউটিউবে একজন দুঃখ করে বলেছিলেন,‘ কি আজব! বিশ্বের কোথাও কোনো বড় ভূমিকম্প হলেই এই পুরান ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।’

অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়েও একই ঘটনা হয়। যেমন ভূমিধসের খবর প্রচার করার সময় প্রায়ই যে বিধ্বস্ত ভবনটি জুড়ে দেয়া হয় আসলে সেটি মিশরের। কিন্তু পৃথিবীর যেখানেই ভূমিধস হইক না কেন সাংবাদিকরা এ ছবিটিই ব্যবহার করেন। কেন করেন, তাও এক রহস্য বটে! আসলে রহস্য ফহস্য কিছু নয়, প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগেও আমরা সাংবাদিকরা যে কতটা অজ্ঞ তারই প্রমাণ হচ্ছে এসব ছবি।

or

ইউরোপের শরণার্থী
চলতি বছর ইন্টারনেটে শরণার্থীদের একটি ছবি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ছবিটি ছিল সেনেগালের এক নাগরিকের যিনি সুদূর স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তার নাম আবদু দিওফ এবং তিনি ডাকার ছাড়ার সময় সেলফিটি তুলেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। হাজার হাজার লোক এটি দেখেছে ও শেয়ার করেছে। নানা ধরনের উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য করেছেন।  কিন্ত উপরের দুটি ছবির মত এটিও ভুয়া। ফ্রান্সের ফটোগ্রাফি উৎসবে প্রচারণার জন্য এই ছবি তোলা হয়েছিল এবং উৎসাহী লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ইচ্ছে করেই ভুল তথ্য দিয়েছিলেন উৎসবের আয়োজকরা। কিন্তু এ ধরনের মিথ্যা কি ক্ষমা করা যায়!

শরণার্থী

যেভাবে শরণার্থী হয়ে গেলেন আইএস জঙ্গি
চলতি বছর শরণার্থী বিশেষ করে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলো জুড়ে ছিল এদেরই সংবাদ ও ছবি। এরই মধ্যে ফেসবুকে সবচেয়ে সাড়া জাগানো ছবিটি ছিল এক সিরিয় শরণার্থীর। তার প্রকৃত নাম লেইথ আল সালেহ। তিনি ফ্রি সিরিয়ান আর্মির সাবেক কমান্ডার হিসেবে প্রেসিডেন্ট বাশির আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এ বছর আগস্টে তিনি ইউরোপের মেসিডোনিয়ায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন। অথচ ফেসবুকে তাকে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সত্যটি প্রকাশিত হওয়ার পর ছবিটির শেয়ারদাতা ক্ষমা চেয়েছেন।

প্যারিস হামলার সময়ও আমরা একই ঘটনা দেখতে পেয়েছি। গত নভেম্বরে হওয়া ওই হামলার হামলাকারী হিসেবে যার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল তিনি ছিলেন প্রবাসী ভারতীয় শিখ ধর্মাবলম্বী ভিরেন্দর জুব্বাল। ওই ছবি প্রকাশ করেছিল স্পেনের খবরের কাগজ লা-রাজন। ছবির  ক্যাপশনে লেখা ছিল-‘প্যারিসে হামলাকারীদের একজন’। ওই পত্রিকার প্রতিবেদনে আরো লেখা হয়, ‘হামলাকারীদের মধ্যে একজন সিরিয়ান শরণার্থীদের সঙ্গে গ্রিসে প্রবেশ করেছে।’ জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ায় লা-রাজন অবশ্য ক্ষমা চেয়েছে।

যেভাবে শরণার্থী হয়ে গেলেন আইএস জঙ্গি

কানাডার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ভিরেন্দর সম্প্রতি বাথরুমে গোসল করা সময় পাগড়ি পড়ে সেলফি তুলেছিলেন। সেটি তিনি ফেসবুকে দিয়েছিলেন। দাড়ি টুপি দেখে তাকে বানিয়ে দেয়া হয় সন্ত্রাসী। ফটোশপের সাহায্যে জুব্বালের হাতে ধরা আইপ্যাডের জায়গায় কোরআন শরিফ আর গায়ে ভেস্ট বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ছবিতে একখানা ‘সেক্স টয়’ জুড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে কে বা কারা এই ফটো কারসাজি করেছে তা অবশ্য জানা যায়নি।

বিভ্রান্তিমূলক

প্যারিস হামলার পর এ ধরনের আরো অনেক রটনা আর বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। হামলার পর বাটাক্ল কনসার্টে মার্কিন রক ব্যান্ড ‘ ইগলস অব ডেথ মেটাল’য়ের সঙ্গীত পরিবেশনের যে ছবিটি সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল আদতে সেটি সে শহরেরই নয়। যদিও ছবিটির ক্যাপসনে লেখা ছিল,‘হামলার আগ মুহূর্তে বাটাক্ল থিয়েটারের দৃশ্য।’ আসলে এটি ছিল ডাবলিনের অলিম্পিক থিয়েটারের ছবি এবং হামলার মাত্র একদিন আগে নিজেদের ফেসবুকে এটি পোস্ট করেছিল ডেথ মেটাল। এটি মেটালের পারফর্মের ছবি হলেও স্থান ও সময় কিন্তু আলাদা।

প্যারিসের জনশূণ্য রাস্তাঘাট
প্যারিস হামলার পর সে শহরের জনশূণ্য রাস্তাঘাটের একটি ছবি বারবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। আতঙ্কিত শহরবাসীর প্রকৃত অবস্থা বোঝানোর জন্য কতবার যে এটি রিটুইট হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। এটি আসলে প্যারিসের ছবি নয়- ‘সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ নামের এক প্রকল্পের ছবি। ফটোগ্রাফির চতুরতায় এটিই হয়ে গেছে প্যারিসের ভয়ার্ত নগরী।

প্যারিসের জনশূণ্য রাস্তাঘাট

হতাশাগ্রস্ত স্বামী ও অর্ধেক গাড়ি
সবশেষে আসছি ফেসবুকে ঝড় তোলা অর্ধেক গাড়ির ছবিটি নিয়ে। ছবিটি ছিল জার্মানির এক তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর যিনি তাকে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়তে সংসারের সব জিনিসপত্র অর্ধেক করে নিলামে তুলেছিলেন। বাদ যায়নি তার শখের গাড়িটিও। এটি গত জুনের ঘটনা। এ নিয়ে তখন সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে। বাংলামেইলের পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে আমাদের বিচিত্র বিভাগেও ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

অর্ধেক গাড়ি

আসলে পুরো ঘটনাটিই ছিল বানোয়াট। গাড়িটি ছিল ‘ইবে’ নামের এক নিলাম কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ছবি।  ব্যবসায়িক ফায়দা লুটতে ওই গাল গপ্পো ছড়ানো হয়েছিল। ইউটিউবে ওই ভিডিউ ৪৫ লাখ শেয়ার হয়েছিল। পরে অবশ্য  জার্মান বার এসাসিয়েশন সত্যটা স্বীকার করে নেয়। এই ভিডিওটি যে তারাই তৈরি করেছিল।

কিন্তু এভাবে মিথ্যা ছাড়ানো হলে একসময় সত্য ঘটনা নিয়েও ইউজারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও। এভাবে মিথ্যা বা ভুল ছবি ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করে দেখানোর ফলে শেয়ার বা লাইক ব্যবসায় সাময়িক লাভ হলেও আদতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা সামাজিক মাধ্যমগুলোই।






মন্তব্য চালু নেই