মেইন ম্যেনু

‘৩০ লাখ শহীদে লাভ-ক্ষতি’

সিরাজী এম আর মোস্তাক : বর্তমানে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে মাত্র দুই লাখ এবং গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা মাত্র ৪১ জন। শহীদ মাত্র সাতজন, তারা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত। এটাই মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের প্রকৃত তালিকা। এছাড়া আর কোনো তালিকা নেই। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় শুধুমাত্র এ দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা, ৪১ বীরাঙ্গনা ও সাতজন শহীদের একক অবদান। আর কারো কোনো অবদান নেই। খোদ বঙ্গবন্ধুও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভূক্ত নন। একইভাবে ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনেরও তালিকা নেই। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর উক্ত নির্ধারিত সংখ্যক তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভবও নয়। এখন প্রশ্ন হলো, এ ত্রিশ লাখ শহীদ সংখ্যায় লাভ বা ক্ষতি কী?

ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের সংখ্যাটি নির্ধারণ করেছেন, বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানে অবরূদ্ধ ছিলেন। তার সাথে আরো প্রায় পাঁচ লাখ বাঙ্গালি পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু দেশ-বিদেশের সকল যোদ্ধা ও শহীদদেরকে এক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেন। বিশেষ কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে চার ধরণের (বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক) খেতাব প্রদান করেন। এছাড়া অবশিষ্ট সমগ্র জনতা ও শহীদদেরকে তিনি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। তিনি যেহেতু বাংলাদেশের জনক, তাই তার কাছে কোনো নাগরিকই মুক্তিযোদ্ধা বা অমুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। অর্থাৎ বর্তমানে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও তালিকার অবৈধ বৈষম্যটি তার সৃষ্টি নয়। তার কাছে ত্রিশ লাখ শহীদ যেমন মুক্তিযোদ্ধা, ঠিক তেমনি ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি প্রত্যেকে এক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিতে ত্রিশ লাখ সংখ্যাটি সুনির্ধারিত ও সুবিদিত। এ বিষয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।

ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটি সন্দেহপূর্ণ হয়েছে, মূলত মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে অসাধু রাজনীতিবিদগণ নিজেদের স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধা কোটানীতি চালু করেছে। তারা দেশের মানুষকে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, পাকিস্তানী দালাল ও ভারতীয় দালালে বিভক্ত করেছে। মাত্র প্রায় দুই লাখ ব্যক্তিকে তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। দেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ সম্পুর্ণ অবৈধভাবে উক্ত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভাতা হিসেবে প্রদান করেছে। তাদের অযোগ্য সন্তান-সন্ততিদেরকে অন্যায় বৈষম্যের মাধ্যমে কোটাসুবিধা দিয়েছে। খোদ বঙ্গবন্ধু কন্যা এ সুবিধা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন। তিনি অবৈধ তালিকাভুক্তদের নাতি-নাতনিদেরকেও কোটা সুবিধায় সংযুক্ত করেছেন।

প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার অবৈধ কোটানীতি বাতিল হলে, ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটি চিরসত্যরূপে বিবেচিত হতো। কারণ, শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ হলে মুক্তিযোদ্ধাদের মাত্র দুই লাখ সংখ্যাটি মোটেও মানায় না। কোনো যুদ্ধে শহীদের চেয়ে যোদ্ধা কখনো কম হয়না। বরং যোদ্ধাদের মধ্যে শহীদ, গাজী, আহত ও বন্দী সবই থাকে। সকল যোদ্ধা কখনো শহীদ হয়না। যোদ্ধাদের কতক শহীদ হয়, কতক বন্দী হয় আর অনেকে হয় গাজী। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও তাই হয়েছে। এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েছে, দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, বঙ্গবন্ধুসহ প্রায় পাঁচ লাখ বাঙ্গালি বন্দী দিন কাটিয়েছে, প্রায় এক কোটি বাঙ্গালি ভারতে শরণার্থী হয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করেছে এবং অবশিষ্ট সকল বাঙ্গালি দেশে অবস্থান করে যে যেভাবে পেরেছে, প্রাণপণ লড়াই করেছে। তারা প্রত্যেকে এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই যতোদিন বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও তালিকা বাতিল না হবে, ততোদিন ত্রিশ লাখ শহীদদের সংখ্যাটি বিতর্কিতই থাকবে।

অতএব, সকল প্রকার লাভ-ক্ষতি পরিত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী ত্রিশ লাখ শহীদের বিষয়টি নিস্পত্তি করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য অনুসারে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও তালিকা বাতিল করত: বাংলাদেশ-ভারত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী বীর শহীদ ও যোদ্ধা সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করলেই তা নিস্পত্তি হবে। যেমন নিস্পত্তি হয়েছে, হিটলার কর্তৃক ইহুদী হত্যাকান্ডের ষাট লাখ সংখ্যাটি। সেখানে কেউ বিশেষ যোদ্ধা পরিচয় দেয়নি বা অবৈধ কোটাসুবিধা ভোগ করেনি বিধায় ষাট লাখ অবাস্তব সংখ্যাটিও সঠিকরূপে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশেরও তা সম্ভব। দেশের বর্তমান ষোল কোটি নাগরিক সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করলেই ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটি সঠিকরূপে গৃহীত হবে।






মন্তব্য চালু নেই