মেইন ম্যেনু

৩ টাকার লবণ বিক্রি ৩২ টাকায়!

উৎপাদন পর্যায়ে দাম না বাড়লেও ভোক্তা পর্যায়ে দেশে লবণের দাম এক দফা বেড়েছে। প্রতিকেজি লবণে ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যে লবণ উৎপাদন পর্যায়ে বিক্রয় হচ্ছে ৩ টাকা থেকে সাড়ে ৪ টাকায় সেই লবণ ভোক্তারা ক্রয় করছে ৩২ টাকায়। আর তা বিভিন্ন কোম্পানি রিফাইন করে বাজারজাত করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছে লবণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে লবণের দাম বেড়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, গত ১৫ দিন ধরে খাবার লবণের দাম বেড়েছে। খাবারের লবনের পাশাপাশি ডাইং প্রিন্টিং, টেক্সটাইল এবং চামড়া খাতে ব্যবহৃত লবনের দামও বেড়েছে।

এদিকে চামড়ায় ব্যবহার উপযোগী লবণের দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘লবণের দাম বাড়ার কারণে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়ায় লবণ কম ব্যবহার করবেন। এতে চামড়ার গুনগত মান খারাপ হওয়া আশঙ্কা রয়েছে।’

তারা বলছেন, ‘দেশের লবণের উৎপাদন এবার কম হওয়ায় সরকারকে আমরা অনুরোধ করেছিলাম লবণ আমদানি করতে। কিন্তু যে লবণ আমদানি করা হয়েছে তা খুবই নিম্নমানের। এ কারনে এসব লবণ চামড়ায় ব্যবহার করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।’ তাই চামড়ার গুনগত মান রক্ষা করতে তারা দেশে উৎপাদিত লবণ ব্যবহারের আহ্বান জানান।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘লবণের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। চামড়ায় ব্যবহারের উপযোগী প্রতি বস্তা (২ মন ওজন) লবণের দাম কয়েকদিন আগেও (১৫ দিন পূর্বে) ছিল ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। বর্তমানে এসব লবনের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৬৭০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায়। এতে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়ায় পরিমাণের চেয়ে কম লবন ব্যবহার করবেন। ফলে চামড়ার গুনগত মান নষ্ট হওয়া আশঙ্কা আছে।’

তিনি বলেন, ‘লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার কিছু লবণ আমদানি করেছে। যা খুবেই নিম্নমানের। এসব আমদানিকৃত লবণ চামড়ায় ব্যবহার করলে গুনগত মান টিকিয়ে রাখা যাবে না। তাই আমদানি করা লবণ চামড়ায় ব্যবহার না করাই ভালো বলে মনে করছেন তিনি।’

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসিআই, ফ্রেশ, মোল্লা সল্ট, ডলফিন, কনফিডেন্স অন্যান্য ব্যান্ডের প্যাকেট জাত আয়োডিনযুক্ত লবনে প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১ টাকা থেকে ২ টাকা। এসব প্যাকেটজাত প্রতিকেজি লবণ বর্তমানে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এসব লবণ বিক্রি হতো ২৩ টাকা থেকে ২৪ টাকায়। এছাড়া খোলা লবণ প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৫০ পয়সা থেকে ৮০ পয়সা। বর্তমানে খোলা লবণ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৮ টাকা থেকে ৯ টাকায়। যা আগে ৭ টাকা থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হতো।

লবন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতি বস্তা (২ মন ওজনের) খাবার উপযোগী খোলা লবণের দাম ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা, ডায়িং, টেক্সটাইল ও চামড়ায় ব্যবহার উপযোগী লবণ কয়েকদিন আগে ৫০০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬৭০ টাকা থেকে ৭০০ টাকায়।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে লবণ উতপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন। এ অর্থবছরে প্রকৃত উতপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিকটন। ওই বছর লবনের চাহিদা ছিল ১৫ লাখ মেট্রিক টন। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হয়েছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিকটন।

চলতি বছর লবণ উতপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ মেট্রিকটন। এবছর দেশে লবণের চাহিদা আছে ১৬ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিকটন। আর উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৮২ হাজার টন। এছাড়া আগের বছরের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ মেট্রিকটন। সব মিলিয়ে মজুদ আছে ১৫ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিকটন। যা চাহিদার তুলনায় ৭৬ হাজার মেট্রিকটন কম।

বিসিক সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে অর্থাত উৎপাদন পর্যায়ে প্রতিমন সাদা লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৫৬ টাকায় (প্রতি কেজি ৩ টাকা ৯০ পয়সা), কালো লবণ ১২০ টাকায় (প্রতি কেজি ৩ টাকা), পলিথিন লবণ ১৭৭ টাকায় (প্রতি কেজি ৪ টাকা ৪২ পয়সা) বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর মহাব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ) মমতাজ মকসুদ বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম বাড়েনি। ভোক্তা পর্যায়ে প্যাকেটজাত লবণের দাম কেন বাড়ানো হয়েছে সে বিষয়ে বলতে পারছি না। তবে ঈদ-উল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়ায় লবণ লাগে সে কারণে চাহিদা বেড়ে যায়। দেশে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় লবণ উৎপাদনে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এ কারণে দেশে চাহিদা মেটাতে ১ লাখ টন লবণ আমদানি হয়েছে। এছাড়া দেশে অনেক লবণ মজুদ আছে তাতে লবণের সঙ্কট হবে না।’

বিসিক কক্সবাজার আঞ্চলিক অফিসের ডিজিএম আবসার উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে দেশে বৃষ্টিপাত একটু বেশি হওয়ার কারণে লবণের উৎপাদন কম হয়েছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লবণের উৎপাদন আরও বাড়বে। তখন লবণের সঙ্কট হবে না বলে জানান তিনি।

লবণের মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায় থেকে সাদা লবণ ক্রয় করে বড় ব্যবসায়ীরা। তারা কোনো না কোনো মাধ্যমে লবণ ক্রয় করে থাকে। এরপর কারখানায় রিফাইনড করে লবণ প্যাকেটজাত আকারে বিক্রি করা হয়। প্যাকেটজাত লবণের বর্তমান বিক্রয়মূল্য ৩২ টাকা। এসব লবণে সোডিয়াম ক্লোরাইড দিয়ে সাদা ঝরঝরে করা হয়। আর তাতে মাঠ পর্যায় থেকে দাম বেড়ে যায় প্রতি কেজিতে ২০ টাকা থেকে ২১ টাকা।

এদিকে মোল্লা সল্ট এর উতপাদন ও বিপণন কর্মকর্তা আশিষ কুমার সাহা বলেন, ‘আসলে মাঠ পর্যায় থেকে কম দামে লবণ কেনার পর তা রিফাইনড করতে অনেক খরচ হয়। তাছাড়া এ খাতে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। সব মিলিয়ে লবণ ভোক্তা পর্যায়ে খাবার উপযোগি করে পৌছানোর পর প্রতিকেজি লবণে খুব সীমিত লাভ রাখা হয়। এছাড়া বর্তমানে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। ফলে ব্যবসায় ব্যয়ও বেড়েছে।’ তাই প্রতিকেজি লবণে সামান্য দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লবণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌছতে ক্রেতাদের অতিরিক্ত অর্থ গুণতে হচ্ছে। যদি সরকার এ বিষয়ে নজর দেয় তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে লবণের দাম কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘লবণের দাম মাঠ পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায়ে এতো পার্থক্য থাকাটা উচিৎ নয়। এটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে হয়েছে। যা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা সামিল।’ ভোক্তারা যাতে আরো কম দামে লবণ ক্রয় করতে পারে সেদিকে সরকারের নজর দেয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। বাংলামেইল






মন্তব্য চালু নেই