মেইন ম্যেনু

‘৪৫ বছর ধরে কলঙ্কিনী হয়ে বেঁচে আছি’

‘ওদের হাত থেকে রক্ষা পেতে জুড়ী নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। নদী থেকে তুলে আমাকে নিয়ে এলো ঘরে। এরপর স্বামীর হাত-পা বেঁধে তার চোখের সামনেই…।’- আর কথা বলতে পারলেন না সিলেটের বীরাঙ্গনা জোছনা বেগম চৌধুরী। কেঁদে ফেললেন। চোখ দিয়ে ঝরছিল অশ্রু। বললেন, ‘৪৫ বছর ধরে কলঙ্কিনী হয়ে বেঁচে আছি। কোনো সমাদর পাইনি।

উল্টো পেয়েছি অবহেলা আর লাঞ্ছনা।’ জোছনা বেগম চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জন্য ইজ্জত বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য দেখেছেন স্বামী মাস্টার ছোয়াব আলী খান। পাক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে চলে এলেন শ্বশুরবাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জের ভাটেরায়। কাউকে কিছু বলেননি। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে শ্বশুরালয়ে রেখে চলে গেলেন যুদ্ধে। আর ফিরেননি তিনি। যুদ্ধ করতে করতে এক সময় যুদ্ধের ময়দানেই ছোয়াব আলী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মুখে হাসি ফুটেছে জোছনা বেগমের।

এবার সরকারের বীরাঙ্গনায় তালিকায় এসেছে তার নাম। নাম তুলতেই অনেক কষ্ট হয়েছে তার। ছুটেছে দুয়ারে দুয়ারে। অনেকেই তাকে ঘৃণার চোখে দেখেন। এতোদিন কেউ মুখ তুলে থাকায়নি। কিন্তু ৪৫ বছর পর জোছনার মুখে হাসি তুলে দিয়েছেন সিলেটের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। তিনি খুঁজে বের করলেন জোছনা বেগমকে। আবিষ্কারের পর আর তাকে স্বীকৃতি প্রদানে দেরি হয়নি। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন জোছনা বেগম চৌধুরী। স্বামী মারা গেছেন যুদ্ধে। তখন ৬ মাসের সন্তান ছিল মিলাদ হোসেন খান।

তাকে নিয়ে আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি। নেহাত গরিবের সংসার। সরকারের খাস জমিতে ঘর বানিয়ে থাকেন। ছেলে ফেঞ্চুগঞ্জ কারখানায় কাজ করে রোজ কামলা হিসেবে। এতো সবের মাঝে স্বীকৃতির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। আর এবার স্বীকৃতির পর তিনি আপ্লুত। জানালেন, এখনও অনেকেই রয়েছেন যারা সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। তারা অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ওদের খুঁজে বের উচিত। এবং যথাসম্ভব সম্মানিত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। জীবনের শেষ বেলায় এই স্বীকৃতি তাকে আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।

আরেক বীরাঙ্গনা লাইলী বেগম। বাড়ি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুরে। যুদ্ধের সময় লাইলীর বয়স বেশি নয়। মাত্র ১৫ বছর। তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। পিতা ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। যুদ্ধ শুরু হতেই পিতা আবদুল লতিফ ছাড়লেন বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে লাইলী ও তার মা একা। এ কারণে লাইলীর চাচা চলে এলেন বাড়িতে। তখন যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। পাক বাহিনী হঠাৎ একদিন বাড়িতে হানা দেয়। ধরে নিয়ে যায় চাচাকে। ফেঞ্চুগঞ্জের গুদামঘরে রেখে চাচা কালা মিয়াকে বেধড়ক মারধোর করে।

এতে অনেকটা কাতর হয়ে পড়েন কালা। বাড়িতে এমন কেউ নেই যে দেখতে যাবে। সাহস করে যমের মুখেই চলে গেলেন লাইলী বেগম। ফেঞ্জুগঞ্জের গুদামঘরে গিয়ে দেখেন চাচা কালা মিয়া রক্তাক্ত। গোটা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। আর পাক বাহিনী তাকে ঘিরে রেখেছে। এ দৃশ্য দেখে চাচাকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান লাইলী বেগম। বললেন, ‘চাচা মরে যাবে আর মারবেন না।’ এ সময় পাক বাহিনী লাইলীকে দেখে লালসার চোখে। খারাপ খারাপ মন্তব্য করেন। আর তা দেখে মৃতপ্রায় চাচা কালা মিয়া প্রতিবাদ করেন।

বার বার লাইলীকে বলেন- ওখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। এ সময় হঠাৎ ঘাতক পাক বাহিনীর হাতের অস্ত্র সক্রিয় হলো। গুলি গিয়ে লাগল চাচা কালা মিয়ার বুকে। আর্তনাদ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন কালা মিয়া। পাক সদস্যরা লাইলীকে আটক করে একটি ঘরে নিয়ে বন্দি করে। এরপর ওই ঘরেই চলে তার উপর নির্যাতন। পাক সদস্যরা এসে তাকে নির্যাতন করে বাইরে চলে যায়। এরপর তাকে নিয়ে রাখা হয় একটি বাংকারে। যতবারই নির্যাতন করা হতো ততবারই অজ্ঞান হয়ে পড়তেন লাইলী বেগম।

পাক সদস্যরা টানা ১০ দিন নির্যাতনের পর লাইলী রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফরমে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করেন। এরপর হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে লাইলী বেগমের। বলেন, ওদের নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ৪৫ বছর ধরে তিনি ওষুধ খেয়ে চলছেন। লাইলী বেগম জানালেন, পাক সেনাদের হাতে কলঙ্কিত হওয়ার পর ভালো জায়গায় বিয়ে হয় না। পরে তার পিতা গ্রামের এক অসহায় ছলে নুরু মিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেন। এখন তার সংসারে ছেলে, মেয়ে রয়েছে।

কিন্তু কেউ তার সঙ্গে নেই। স্বামী আছে। সংসার করছেন ১৯৮৩ সাল থেকে। কিন্তু স্বামীর নিখাদ ভালোবাসা পাননি কখনও। লাইলী জানালেন, দীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি তার নির্যাতনের কথা বলেছেন অনেকেরই কাছে। কিন্তু কেউ তার কথায় কান দেয়নি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে তিনি পেয়েছেন এ স্বীকৃতি। তাদের যুদ্ধকালীন স্মৃতি, ৪৫ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে কথা হয়। কিন্তু এসব বীরাঙ্গনাদের কেউ সুখী নয়। সমাজ, পরিবার তাদের দেখেছে ভিন্ন চোখে।

পুরো জীবনটাই যেন হয়ে গেছে কলঙ্কময়। এরপরও আশায় বুক বেঁধে ছিলেন তারা। অবশেষে মিললো স্বীকৃতি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘুরেনি তাদের ভাগ্যের চাকা। গেজেট প্রকাশ হলে সেটি হাতে পৌঁছেনি। খবর পেয়েছেন মুখে মুখে। অভাব অনটনের সংসারে একটু সুখ খুঁজে পেতে তারা তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। আর তাদের প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে সু-চিকিৎসা। এমনটি জানালেন বীরাঙ্গনা জোছনা ও লাইলী। মানবজমিন






মন্তব্য চালু নেই