মেইন ম্যেনু

"মৃত্যুর সময়ও যেন এটি আমার গায়ে থাকে"

৫০ বছর ধরে যার গায়ে ‘মুজিব কোট’

মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (৭৮)। আটাত্তর বছর বয়সের আওয়ামী লীগে টানা ৫০টি বছর পার করে দিয়েছেন মুজিব কোট গায়ে দিয়ে। কি গরম-কি ঠান্ডা মুজিব কোট তার গায়ে থাকেই। এমনকি ঈদ-কোরবানের পোশাকের সাথেও থাকে সেটি। সেই ১৯৬৪ সালে প্রথম একটি মুজিব কোট তিনি সেলাই করেছিলেন। তাও বঙ্গবন্ধুর কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে।

সেই মুজিব কোট গায়ে দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে মঞ্চে উঠলেন তখন বঙ্গবন্ধু নাকি মুচকি হেসে বলেছিলেন-সত্যিইতো তোকে বেশ মানিয়েছে, সব সময় পড়বি কিন্তু…। তার সেই থেকেই দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে মুজিব কোট আর ছাড়া হয়নি তাঁর। আপাদ মস্তক একজন আওয়ামী লীগার নুরুল ইসলাম বললেন, মৃত্যুর সময়ও যাতে এটি আমার গায়ে থাকে-এটাই আমার কাম্য।

আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজার জেলা শহরের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র দৈনিক কক্সবাজার এর সম্পাদক ও প্রকাশক হলেও তিনি আওয়ামী লীগার হিসাবেই সবচেয়ে বেশী পরিচিত। কেননা তিনি আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালেও একমুহুর্তের জন্যও মুজিব কোট খুলেননি। মুজিব কোটের সাথে আপোষও করেননি কোন দিন। মুজিব কোট নিয়ে বিব্রত নন রিতীমত, গর্ব করেন তিনি।

তিনি বলেন, মুজিব কোট নিয়ে আমি দেশের জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা সময় তাদের ডাকে দেখা করতে গিয়ে বার বার বাঁধার সন্মুখিন হয়েছিলাম। তবুও আমি মুজিব কোট খুলিনি। নিজের প্রথম পুত্র সন্তান জন্মের সময় তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পাশে। পুত্র সন্তান জন্মের খবরটি তিনি প্রথম জানান প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে।

সুখবরটি শোনে নুরুল ইসলামের সন্তানে নাম রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের নামের সাথে মিলরেখে নুরুল ইসলামে ছেলার নামদেন মুজিবুল ইসলাম। এই ছেলে বর্তমানে দৈনিক কক্সবাজার এর পরিচালনা সম্পাদক।
কক্সবাজার আওয়ামীলীগে বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত সৈনিক আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও। ক্ষমতায় থাকাকেলে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্সবাজার সফরে এসে সার্কিট হাউজে প্রেস ক্লাব সভাপতিকে ডেকে আনেন। তিনি গেলেন যথারিতী। কিন্তু সেখানে যেন বিধি বাম। মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের গায়ে মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতির সফর সঙ্গীরাও এক প্রকার হতবাক। এমনকি রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষীরা এগিয়ে এসে সার্কিট হাউজের ফটকেই মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে থামিয়ে দেন।

দেহরক্ষীরা তাকে বললেন, গায়ে মুজিব কোট খুলে যেন রাষ্ট্রপতির সাথে বসেন। তাতেও তিনি রাজি হলেন না। অগত্যা মুজিব কোট গায়ে তাকে ঢুকার অনুমতি দেয়া হল। পুরো অনুষ্ঠানে ছিলেন কেবল তিনি একাই মুজিব কোট গায়ে। ফলে সবারই দৃষ্টি ছিল তার উপর। মুজিব কোট দেখে জিয়াউর রহমানও বারং বার তাকালেন তার দিকে। এক সময় মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাছে নিয়ে বললেন, আসুন আমার সাথে দল করি।

জবাবে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, আমার গায়ে মুজিব কোট-আমি দল করি বঙ্গবন্ধু মুজিবের। প্রতিউত্তরে রাষ্ট্রপতি জিয়াও নাকি বলেছিলেন-আমরাওতো বঙ্গবন্ধুর…কিন্তু তিনিতো এখন নেই। মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম জানালেন, রাজধানী ঢাকায় গনভবনে ডাক পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেবার দৈনিক কক্সবাজার সম্পাদক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পালা ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়ার সময় আপত্তি ঊঠল তার গায়ে মুজিব কোট নিয়ে। সংশি¬ষ্টরা তাকে অনুরোধ করলেন, গায়ের মুজিব কোটটি খুলে গাড়িতে রেখে দিতে। তিনি বলেছিলেন- তাহলে আপনারা আমাকে নামিয়ে দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে মুজিব কোট নিয়েই সেই অনুষ্ঠানেও যাবার অনুমতি দেয়া হয়।

সদালাপি নুরুল ইসলাম ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের কক্সবাজার মহকুমা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ সহ সভাপতি। প্রয়াত ফনিভ’ষণ মজুমদার যখন কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক ছিলেন তখন নুরুল ইসলাম ছিলেন দলের পলিট ব্যুরোর সদস্য।

তিনি জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্রাজেডির সময়ও আমি ছিলাম রাজধানী ঢাকায়। এই বিয়োগান্তুক ঘটনার পর অনেকেই মুজিব কোট খুলে লুি য়ে রেখেছিলেন। আমার সঙ্গীয় দলীয় নেতাদেরও ক’জন আমাকে মুজিব কোট খুলতে বলেছিলেন। এমনকি তারা আমার সাথে থেকে নিরাপদ মনে না করে অনেকেই আমাকে ছেড়েও দিয়েছিলেন।

অথচ আমি সেই ক্রান্তিলগ্নেও গায়ের মুজিব কোট নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে পৌঁছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে মুজিব কোট গায়ে দিতেন সেটি আমিও দিই।

আশি দশকে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়ন পরিষদে ২ বার চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন। আপাদ মস্তক একজন আওয়ামী লীগার আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন, মৃত্যুর সময়ও যাতে এটি আমার গায়ে থাকে-এটাই আমার কামনা।






মন্তব্য চালু নেই