‘ইউরোপে যেতে চাই না আমরা’

বিগত কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে শরণার্থী সমস্যা একটি অন্যতম আলোচনার বিষয়। তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে একটি শিশুর মৃতদেহ পাওয়ার পর থেকেই মূলত সিরিয়া থেকে আগত শরণার্থীদের বিভিন্ন দেশ আশ্রয় দিতে শুরু করে। সিরিয়ায় ২০১১ সাল থেকে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়ে পালাচ্ছে। বহুল প্রচারিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সিরীয় শরণার্থীদের ইউরোপ গমন নিয়ে অনেক মানবিক ও তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। কিন্তু ইউরোপগামী সিরীয়দের পাশাপাশি আরও কিছু মানুষ রয়েছে যাদের কথা মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে আসছে না। তেমনি এক অচর্চিত মানবিক অধ্যায় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি।

সিরীয় শহর কোবানির মূল ফটকের সামনে দুজন মানুষ ট্রাকে যাবতীয় গৃহস্থালি দ্রব্যদি তুলছেন। শহরে বোমা হামলা শেষ হয়েছে, বারুদের তীব্র গন্ধও কিছুটা কমেছে কিন্তু সর্বত্র তুর্কি পুলিশ হণ্যে হয়ে ঘুরছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তারা তল্লাসি চালাচ্ছে। উপযুক্ত কাগজপত্র না থাকলে শহর ছেড়ে কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। এরই মধ্যে দুই সিরীয় বাড়ি ফিরে আসছে, ইসলামিক স্টেট কোবানি দখল করে নেয়া পর তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কুর্দি সেনাবাহিনী শহরটির দখল নিলে তারা ফিরে আসার সাহস করতে পেরেছে।

শরণার্থী সমস্যা বলতেই শুধু সাগরে ভাসমান মানবসন্তান বা ইউরোপীয় সীমান্তের পুলিশের তাড়া খাওয়া মানুষের দল নয়। পৈত্রিক ভূমি হারানোর পর থেকে শরণার্থীদের প্রতি পদে পদে ঠোকর খেতে হয়, যার পুরো বাস্তবতা তুলে ধরা সত্যিই দুষ্কর। নিজ দেশ থেকে পালাবার পথেও যে কত ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয় তা কেবল শরণার্থীরাই জানে। আর এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আতঙ্কে অথবা নিজ দেশ ছাড়বেন না এই কারণেও অনেকে হাজারো সমস্যার মাঝেও দেশ ছাড়তে চান না।

ইউরোপের দরজায় যে শরণার্থীরা আজ কড়া নাড়ছে তা মোট শরণার্থী সংখ্যার মাত্র চার শতাংশ। যুদ্ধের কারণে সিরিয়ার প্রায় আট মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে তুরস্ক, জর্ডান এবং লেবাননে প্রায় সাড়ে চার মিলিয়ন শরণার্থী আশ্রয় গ্রহন করেছে। অথচ ইউরোপের মতো এই বিশাল মহাদেশ মাত্র পাঁচ লাখ মানুষকে গ্রহন করতেই নানান নাটকের সৃষ্টি করছে।

তুরস্ক আর সিরিয়ার সীমান্তে অনেকটা সময় ধরেই একজন সিরীয় পুরুষকে চিৎকার করতে দেখা যাচ্ছে। ‘আমি ফিরে যেতে চাই’ বলে চিৎকার করছিলেন। তিনি ইউরোপে যেতে চান না বলে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে আবেদন জানাচ্ছিলেন। সেসময় তিনি বলতে থাকেন, ‘ওখানে আমার পরিবার আছে। বাবা-মাকে ছেড়ে আমি যেতে পারবো না। তাদের অনেকটা বয়সে হয়ে গিয়েছে।’

কোবানিতে অবস্থানরত কুর্দি সেনাবাহিনীর মতে, শহরের ৭০ শতাংশ এলাকাই পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়েও একদল ইসলামিক স্টেট যোদ্ধা কোবানিতে অতর্কিতে আক্রমন চালিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। যুদ্ধের ময়দানের হিসেবে হয়তো কোবানি এখন কুর্দিদের দখলে, কিন্তু কোবানির বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই চলছে কুর্দি বাহিনীর।

মুস্তফা প্রায় ১৮ মাস আগে সিরিয়ায় ফিরে এসেছেন তা স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে। নিজের দেশে থেকেই মারা যেতে চান তিনি ও তার পরিবার। তার কণ্ঠে ফুটে ওঠা অসহায়ত্ব জানান দেয়, ‘আমার সন্তানেরা তাদের চাচা অথবা চাচীদের চিনতেই পারবে না, কারণ তারা অনেকদিন তাদের দেখেনি।’



মন্তব্য চালু নেই