তিন বছর ধরে দেশি দুর্ধর্ষ জঙ্গীদের জড়ো করছে আইএস

দেশি দুর্র্ধষ জঙ্গীদের দিয়েই বাংলাদেশে আইএস শেকড় গাড়ার চেষ্টা করছে। এমন তৎপরতা চলছে তিন বছর ধরে। তারই অংশ হিসেবে অনেক দুর্র্ধষ জঙ্গীকে বেনামে জামিনে ছাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। জামিনপ্রাপ্তরা নিখোঁজ। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গীরা; যাদের অধিকাংশই দেশেই আত্মগোপনে রয়েছে। এই আত্মগোপনে থাকা জঙ্গীদের মধ্যে অন্তত ত্রিশ জনের হদিস পেতে মরিয়া হয়ে পড়েছে সরকার। তাদের হদিস বের করা সম্ভব না হলে যে কোন সময় দেশে বড় ধরনের হামলা হতে পারে। বিদেশে অবস্থানরত সন্দেহভাজন বাংলাদেশীদের দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যারা দেশে ফিরবে তাদের সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বহুদিন ধরেই বিশ্বে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত ১৮টি দেশে জঙ্গীবাদ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। আল কায়েদা বাংলাদেশে ভয়াবহ হামলা চালাতে পারে বলে ২০১০ সালে সরকারকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে আগাম জানানো হয়েছিল। খবর দৈনিক জনকণ্ঠের।

২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি একটি প্রভাবশালী দেশে টানা অন্তত ৫ ঘণ্টার বিশেষ গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে অংশ নেন ১১১টি দেশের ১১১ সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। যারা সারা পৃথিবীতে জঙ্গীবাদ নিয়ে কাজ করেন। অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে জঙ্গীবাদ বিষয়ে কাজ করছেন। বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জঙ্গীদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে বিশেষ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তারমধ্যে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার পাশাপাশি বাংলাদেশের জেএমবি ও হুজির ওপরও পৃথক পৃথক বিশেষ প্রতিবেদন দাখিল করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, হুজি ও জেএমবি আল কায়েদার সহযোগী সংগঠন। আমেরিকা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আল কায়েদা ও তাদের সহযোগী সংগঠনের হামলার পরিকল্পনা অব্যাহত থাকবে। এসব দেশে নিয়মিতভাবে আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা বাস্তবায়ন করা হবে।

নতুন দেশ হিসেবে আল কায়েদার পরবর্তী টার্গেট বাংলাদেশ। সেক্ষেত্রে আল কায়েদা বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর হামলা চালাতে পারে। হামলা বাস্তবায়নে আল কায়েদার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী, হুজি ও জেএমবি। প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীকেও জঙ্গী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদিও জামায়াতে ইসলামী এমন অভিযোগ বরাবরই ভিত্তিহীন দাবি করে আসছে।

ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, হামলা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে সীমান্তসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ চলছে। কোন কোন ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী, জেএমবি ও হুজির কেউ কেউ হামলায়ও অংশ নিতে পারে।

ওই বছরের ১২ ফেব্র“য়ারি এমন প্রতিবেদনের কপি পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি), পুলিশ, র‌্যাবসহ প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। প্রতিবেদনে সরকারকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সীমান্তে শক্তিশালী সিসি ও মুভি ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়। সীমান্তে কড়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিকমানের জঙ্গীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বহু জঙ্গী সীমান্তপথে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায়। তারা নানাভাবেই চেষ্টা করছে বাংলাদেশে প্রবেশের।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গীবাদের নেটওয়ার্ক বাড়ার বিষয়টি প্রকাশ পায় ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে জেএমবির মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসাম জঙ্গী সংগঠনটির শূরা সদস্য হাফেজ রাকিব হাসান ওরফে মাহমুদ ওরফে রাসেল (৩৫) ও মোঃ সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে তৌহিদ (৩২) এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মোঃ জাহিদ হোসেন সুমন ওরফে বোমারু মিজানকে (৩০) ছিনিয়ে নেয়ার মধ্যদিয়ে। পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে রাকিব নিহত হয়। অন্য দুজন আজও নিখোঁজ। তাদের হদিস মেলেনি। আর যারা তিন জঙ্গীকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, আজও তাদের অনেকেই গ্রেফতারের বাইরে। এমনকি পুরো পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড সম্পর্কে এখনও অনেক কিছুই অজানা। ত্রিশালের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেকেই এখনও দেশেই আত্মগোপনে। তারা দেশে আরও বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছে।

গত বছরের ২ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে জেএমবি আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণে ২ জন নিহতের ঘটনায় ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সাজিদ ওরফে বোরহান ওরফে মাসুম গ্রেফতার হয়। এছাড়া বর্ধমানের ওই বাড়ি থেকে গ্রেফতার হয় জেএমবি সদস্যের স্ত্রী রাজিয়া বিবি ও আমিনা বেগম।

পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ে বাংলাদেশের জেএমবির বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন এবং বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনাও জঙ্গীবাদ বিস্তারের আরেক দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের জেএমবির বহু সদস্য সে সময় ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। অনেকেই আজও নিখোঁজ। এ সংক্রান্ত দুই দেশের মধ্যে একটি তালিকা হস্তান্তর হয়েছে। তালিকায় স্থান পাওয়া জেএমবি সদস্যের অনেকেই আজও গ্রেফতার হয়নি। তাদের অনেকেই দেশেই আত্মগোপনে থাকতে পারে।

এছাড়া ২০১৩ সাল থেকেই ব্লগার, লেখক, প্রকাশক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিকে হত্যাকারীদের অনেকেই আজও গ্রেফতার হয়নি। তাদের অনেকেই দেশেই আত্মগোপনে রয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের ফেব্র“য়ারিতে উচ্চ আদালত, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, শিশুপার্ক ও ঢাকা ক্লাবসহ আশপাশের স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার টার্গেট করেছিল জঙ্গীরা। হামলার প্রথম টার্গেটে ছিল শিশুপার্ক ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট। হামলা চালাতে ফেব্র“য়ারিতে ১২ জঙ্গী পুরো এলাকা রেকি করছিল। রেকি করার সময় গ্রেফতার হয় রাইয়ান মিনহাজ ওরফে রাইমু ওরফে আরমি (২৪), পিতা মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ। স্থায়ী ঠিকানা ৩১/১ মধ্যবাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা। রাইয়ান পরিবারের সঙ্গে ঢাকার বড় মগবাজারের ওয়্যারলেসের সেঞ্চুরি মার্কেটের পেছনে সেঞ্চুরি আর্কেডে বসবাস করত। অপরজন আহম্মেদ শাম্মুর রাইহান ওরফে চিলার (২৩)। পিতা মৃত মফিজ উদ্দিন আহমেদ। স্থায়ী ঠিকানা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে। সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার রমনা থানাধীন বড় মগবাজারের ১০৪/১-ক নম্বর অগ্রণী এ্যাপার্টমেন্টের এ-১ নম্বর ফ্ল্যাটে বসবাস করত। তৃতীয় জন তৌহিদ বিন আহম্মেদ ওরফে রিয়াজ ওরফে কাচ্চি (২৪)। পিতা সহিদুল্লাহ আহমেদ। স্থায়ী ঠিকানা যশোর জেলার বাঘারপাড়া থানাধীন রামকৃষ্ণপুর গ্রামে। সে ঢাকার বনানীর ডি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ৯৯ নম্বর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করত। তাদের বিরুদ্ধে ওই দিনই রাজধানীর শাহবাগ মডেল থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে হামলা দায়ের করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের এক উপপরিদর্শক। ওই মামলায় পরবর্তীতে তারা জামিনে ছাড়া পায়। ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই তারা লাপাত্তা। আজও তাদের হদিস মেলেনি।

তিনজনকে গ্রেফতারের সময় পালিয়ে যায় নয় জঙ্গী। তারা হচ্ছে, নিবরাস ইসলাম ওরফে শিমু (২৪), সেজাদ রউফ ওরফে অর্ক ওরফে মরক্কো (২৪), তৌসিফ (২৪), সাবাব সালাউদ্দিন ওরফে হক ওরফে ইনু (২৫), সালভি আলী ওরফে মালাভি (২৫), রিফাত (২৩), তুরাজ (২৪), ইয়াসিন তালুকদার (২৫) ও গালিব (২৭)।

পলাতকদের মধ্যে একজনের সন্ধান মেলে গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ ও বেকারিতে হামলার ঘটনার পর। ছয় জঙ্গী রেস্তরাঁটিতে গলা কেটে ও গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করে। হত্যার আগে জঙ্গীরা রেস্তরাঁর সবাইকে জিম্মি করে। সেই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করার চেষ্টাকালে জঙ্গীদের গ্রেনেড হামলা ও গুলিতে নিহত হন বনানী মডেল থানার ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদ খান ও ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল হক। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা হলি আর্টিজানে অভিযান চালায়। অভিযানে নিহত জঙ্গীদেরই একজন নিবরাস ইসলাম। যে শাহবাগ থেকে পালিয়েছিল।

শাহবাগ থেকে পলাতক সেজাদ রউফ ওরফে অর্কের সন্ধান মেলে গত ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে একটি জঙ্গী আস্তানায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নয় জেএমবি সদস্য নিহতের পর। নিহতদেরই একজন সেজাদ রউফ ওরফে অর্ক।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গুলশান ও কল্যাণপুরের জঙ্গীরা একই গ্রুপের। শাহবাগ থেকে পলাতক অপর সাত জনের হদিস পেতে সারাদেশে অভিযান চলছে। দ্রুত তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হলে দেশে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া জামিনে ছাড়া পাওয়া ৩ জনের বিষয়েও জোরালো অভিযান অব্যাহত। এ তিনজনকে আইনের আওতায় আনা জরুরী হয়ে পড়েছে। এছাড়া কল্যাণপুর থেকে পলাতক জঙ্গী ইকবালকে ধরতে অভিযান চলছে। এরা মোস্টওয়ান্টেড। তাদের গ্রেফতার করতে না পারলে বড় বিপদ ঘটা বিচিত্র নয়।

মোস্টওয়ান্টেডদের পরিকল্পনা জানতে কল্যাণপুরের আস্তানা থেকে আহত অবস্থায় গ্রেফতারকৃত জেএমবি সদস্য রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যানকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। রিগ্যানের কাছে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনায় আট দিনের রিমান্ডে থাকা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম ও তাহমিদের দেয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদের বাইরে মোস্টওয়ান্টেডের তালিকায় রয়েছে ২০ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষিত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক জেএমবি কর্তৃক একের পর এক বড় ধরনের নাশকতার মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী ও সেনাবাহিনী থেকে চাকুরিচ্যুত সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টাকারী নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মাস্টারমাইন্ড মেজর জিয়া। তারা দু’জনই পলাতক। আনসারুল্লাহ বাংলাটিম ব্লগার, লেখক, প্রকাশকসহ মুক্তমনা মানুষদের হত্যার সঙ্গে জড়িত। গুলশানের হলি আর্টিজানে ২০ জনকে হত্যা এবং বিভিন্ন সময় ব্লগার, প্রকাশক, লেখকসহ মুক্তমনা মানুষদের হত্যার ঘটনায় আইএস ও একিআইএসের (আল কায়েদা ইন সাবকন্টিনেন্ট) নামে দায় স্বীকার করে সাইট ইন্টেলিজেন্সের তরফ থেকে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশে আইএস বা আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ শাখার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছে তামিম চৌধুরী ও মেজর জিয়া।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গুলশানের ঘটনার পর থেকে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। সেই অভিযানে অনেক জঙ্গী গ্রেফতার হয়েছে। তবে মোস্টওয়ান্টেড জঙ্গীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। পাশাপাশি সারাদেশে নিখোঁজদের একটি তালিকা করা হয়েছে। যার সংখ্যা আড়াই শ’ ছাড়িয়ে গেছে। এদের অন্তত ১১০ জন জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের অনেকেই ইরাক ও সিরিয়া ছাড়া বিভিন্ন দেশে রয়েছে। অনেকেই আবার দেশেই আত্মগোপনে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র বলছে, শাহবাগ, কল্যাণপুর, ত্রিশালের ঘটনায় অনেক জঙ্গী দেশেই আত্মগোপনে। এছাড়া জেল থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়া দুর্র্ধষ জঙ্গীদের অধিকাংশই এখনও দেশেই আত্মগোপনে আছে। সবমিলিয়ে এ সংখ্যা ত্রিশ জনের মতো। আত্মগোপনে থেকে তারা বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারে। মোস্টওয়ান্টেড এই ত্রিশ জনের বিষয়ে সীমান্ত, বিমানবন্দরসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক করা হয়েছে। যেকোন মূল্যে তাদের হদিস করতে হবে। অন্যথায় আরও বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটা বিচিত্র নয়।

নিখোঁজদের মধ্যে বনানীর তাওসীফ হোসেন, ঢাকার তেজগাঁওয়ের মোহাম্মদ বাসারুজ্জামান, বাড্ডার জুনায়েদ খান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নজিবুল্লাহ আনসারী, ঢাকার আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম, ঢাকার ইব্রাহীম হাসান খান, লক্ষীপুরের এটিএম তাজউদ্দিন, ঢাকার ধানম-ির জুবায়েদুর রহিম, মোহাম্মদপুরের জুন্নুন শিকদার (জঙ্গীবাদে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে একবার গ্রেফতার হয়ে-জামিনে মুক্ত)। নিখোঁজদের মধ্যে সিলেটের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি সপরিবারে জাপান থেকে সিরিয়ায় পাড়ি জড়িয়েছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে।

এছাড়াও নিখোঁজদের বিশেষ তালিকায় স্থান পায় রিদওয়ান ইসলাম তুহিন, আব্দুর রহমান মাসুদ, ডাঃ আরাফাত আল আজাদ ওরফে আবু খালিদ আল বাঙ্গালী ওরফে ডাঃ তুষার, প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার মৃত সাইফুর রহমানের ছেলে তাহমিদ রহমান সাফি ওরফে আবু ইছা আল বাঙ্গালী, অবসরপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ আবু মূসার ছেলে সাইমুন হাছিব মোনাজ অন্যতম। নিখোঁজদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ ইকবালের মেয়ের জামাই একেএম তুরকিউর রহমান, স্ত্রী রিদিতা রাহিলা ইকবালা ও একবছর বয়সী কন্যা রুমাইসা বিনতে তাকিকে নিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর পুরো পরিবার জঙ্গীবাদে বিশ্বাসী। এছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ রেজাউর রাজ্জাকও নিখোঁজ রয়েছেন। তিনিও আইএসে যোগ দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে নিখোঁজদের মধ্যে ২০১০ সালে ইয়েমেনে যাওয়া এক ছাত্রী তাছমুদা হায়দার, রেজোয়ান শরীফ ও মাইনুদ্দিন শরীফের অবস্থান জানতে মরিয়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইয়েমেনে ৫ জন গেলেও তেহজীব করিম ব্রিটিশ এয়ারলাইন্স উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনার দায়ে গ্রেফতার হয়ে ২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়। আর নাফিস আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেফতার হয়ে ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়। ওই সময় গ্রেফতার হয় রেজোয়ান ও মাইনুদ্দিন। পরবর্তীতে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশে আসার পর থেকে তারা নিখোঁজ। দেশে আত্মগোপনে এমন ত্রিশ জনকে মোস্টওয়ান্টেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, বিদেশে পড়াশোনার জন্য যাওয়া ছাত্রদের তালিকা তৈরির কাজ করছে ইমিগ্রেশন বিভাগ। যারা যে দেশে পড়াশোনার জন্য গেছে, তাদের অবস্থান জানাতে সংশ্লিষ্ট দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তাদের নামীয় তালিকার পাশাপাশি বর্তমান অবস্থান ও কর্মকা-ের ফিরিস্তি তৈরির কাজ চলছে। এদের মধ্যে যাদের বিষয়ে সন্দেহ হয়, তাদের সম্পর্কে দেশে ও বিদেশে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। সন্দেহভাজনরা দেশে ফিরলে তাদের সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গীবাদের বীজ বুনতে অর্থের যোগান আসছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে থাকা বাংলাদেশী জঙ্গী ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থের যোগান আসছে। দেশ দুটিতে অন্তত দু’শ’ বাংলাদেশী জঙ্গী রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সমরাস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। দেশ দুটিতে অবস্থানরত জঙ্গীরা ফান্ড গঠন করে অর্থ সংগ্রহ করছে। আর সেই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে দেশ দুটির মুজাহিদীনদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জঙ্গীদের হাতে আসছে। এক সময় অর্থ পাঠানোর মূল দায়িত্ব পালন করতেন জেএমবির কারাবন্দী আমির জামায়াতে ইসলামীর সাবেক কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফরের মেয়ের জামাই সাজ্জাত ওরফে ইজাজ ওরফে কারগিল ও সাখাওয়াতুল কবির। গত বছর সাখাওয়াতুল কবির ও বাতেন এক সহযোগীসহ গ্রেফতার হয়। সাখাওয়াতুল কবির ও ইজাজ দুই ভায়রা ২০০৯ সাল থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল।

২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পেশোয়ারের সেনাবাহিনী পরিচালিত আর্মি পাবলিক স্কুলে ৬ জঙ্গী সশস্ত্র বোমা হামলা ও গুলি চালিয়ে ১৪২ শিশুশিক্ষার্থী ও ৮ শিক্ষককে হত্যা করে। এমন নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর পাকিস্তানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে। সেই অভিযানে গত বছরের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে চালানো এক অভিযানে একটি জঙ্গী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেয়া অবস্থায় গুলিতে নিহত হন ইজাজ ওরফে কারগিল, সাখাওয়াতুল কবিরের ভাগ্নি জামাই অভি, বাতেনের বোন পাকিস্তানে অবস্থিত ফাতেমার স্বামী সায়েম ও সায়েমের বড় বোন জামাই শামীম।

জিজ্ঞাসাবাদে সাখাওয়াতুল কবির জানান, ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সাখাওয়াতুল কবির বাংলাদেশে চলে আসেন। এসেই তিনিই পাকিস্তান থেকে আসা অর্থের বিষয়টি দেখভাল করছিলেন। নিহত ইজাজের প্রত্যক্ষ ম“ আর আর্থিক সহায়তা ও বুদ্ধি-পরামর্শে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের জন্ম হয়। দলটির আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী। সে কারণে ইজাজের পরামর্শে জেএমবি আমির সাইদুর রহমানের পাশাপাশি মুফতি রাহমানীকেও বন্দী জীবন থেকে মুক্তি দিতে ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা হয়। বর্তমানে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছে বহুল আলোচিত মেজর জিয়া।

এখন পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে সূত্রগুলো বলছে, মূলত দেশী দুর্র্ধষ জঙ্গীদের দিয়েই আইএস বাংলাদেশে শেকড় গাড়ার চেষ্টা করছে। আইএসের পছন্দ জেএমবি, হুজি ও আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের জঙ্গীদের। এর মধ্যে পছন্দের শীর্ষে রয়েছে জেএমবি সদস্যরা। কারণ, জেএমবি মারাত্মক অস্ত্রগোলাবারুদ তৈরি ও পরিচালনায় পারদর্শী। জেএমবির রকেটলঞ্চার তৈরির রেকর্ড রয়েছে।



মন্তব্য চালু নেই