‘দেশে সাড়ে তিন বছরে গুম ২২০’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে গত ৩১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ বছরে ২২০ জন গুম হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৩৯ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ১৮ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং ২০ জন বিভিন্ন সময়ে মুক্তি পেয়েছেন। বাকি ১৪২ জনের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংস্থা আসক ও অধিকারের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বরাবরের মতোই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, একটি চিহ্নিত মহল সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্যই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

মানবাধিকার সংস্থা- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে ৫৩ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন ও ২০১৫ সালে ৫৫ জন গুম হয়েছে। এই ১৯৬ জনের মধ্যে লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩৬ জনের। গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ১২ জনকে ও মুক্তি পেয়েছেন ১৯ জন।

আর অপর মানবাধিকার সংস্থা- অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৩ সালে ৫৩ জন, ২০১৪ সালে ৩৯ জন, ২০১৫ সালে ৩৮ জন ও চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে ২৪ জন গুম হয়েছেন। তাদের মধ্যে লাশ পাওয়া গেছে ২৩ জনের। ফিরে এসেছেন ৬৩ জন ও ৬৭ জনের কোনো হদিস মেলেনি।

অধিকারের হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে গুম হওয়া ২৪ জনের মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং ফিরে এসেছেন একজন। এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাওয়া যায়নি ১৫ জনের।

এসব গুম-অপহরণের ঘটনায় র‌্যাব, পুলিশ কিংবা ডিবি পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভিকটিমদের স্বজনরা।

এ অভিযোগ প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, ‘র‌্যাব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আসামি গ্রেফতার করে। কোনো আসামিকে গ্রেফতারের সময় র‌্যাব সদস্যরা নিজেদের পরিচয় দেন এবং গ্রেফতারের পর আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করেন।

এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। দুর্বৃত্তরা অনেক সময় র‌্যাব বা ডিবি পরিচয় দিয়ে অপহরণ করে থাকতে পারে। অপহরণ মামলায় বিভিন্ন সময়ে আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর ভুয়া র‌্যাব বা ডিবি পরিচয়ে অপহরণের প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব। তাই যারা র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনে সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

একই বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সবসময় নিজেদের পরিচয় ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আসামি গ্রেফতার করে। ডিবি পুলিশ ডিবির ইউনিফর্ম পরে অভিযান চালায়। গুম-অপহরণজাতীয় অভিযোগের সঙ্গে কোনোভাবেই পুলিশ বা ডিবি সম্পৃক্ত নয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তরা অপকর্মের কৌশল হিসেবে ডিবি বা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের বিষয়ে সন্দেহ হলে লোকজন নিকটতম থানায় যোগাযোগ করতে পারে। ডিবি বা পুলিশ আসামি ধরার পর আইন অনুযায়ী আদালতে সোপর্দ করে থাকে।’

গত বছরের ১৫ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে দলিল লেখক আমিন, আমিনের স্ত্রী বিউটি ও প্রতিবেশী মৌসুমী এবং ৩১ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের একটি বাসা থেকে মিঠাপুকুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মারজানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার ১৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এই চারজনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

আত্মীয়স্বজন ঢাকায় ও রংপুরে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। র‌্যাব-পুলিশও তাদের গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে চট্টগ্রামের শিপ ব্রেকিং ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন কুসুমকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় গত বছরের ৩ জুলাই। তার স্ত্রী আফসানা নূর জুলি বলেন, প্রায় এক বছর হয়ে গেল তার স্বামীর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কেউ তাদের কাছে চাঁদাও দাবি করেনি।

এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছেন তিনি। ওই মামলা তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ। এখনও ব্যবসায়ী কুসুমের কোনো খোঁজ মেলেনি।

চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের গজনী গ্রাম থেকে কলেজছাত্র প্রভাত মারাক, বিভাস সাংমা ও ওরাজেস মারাককে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন পর্যন্ত এই তিন ছাত্রের কোনো হদিস মেলেনি বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে।

গত বছরের ১৬ মার্চ ফকিরেরপুলের বাসা থেকে ছাপাখানা ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম রুবেলকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে তুলে নেয়া হয়। এর ৪ দিন পর ২০ মার্চ ফকিরেরপুল পানির ট্যাংকের কাছ থেকে ছাপাখানা কর্মচারী রাজু ইসলাম ও শাওনকে একইভাবে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাজুর স্ত্রী রুমানা বলেন, ‘এখনও আমার স্বামীকে ফেরত পাইনি, তার কোনো খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না।’ রুমানার দাবি, ডিবি বলছে- তারা ধরে নিয়ে যায়নি। একইভাবে সন্ধান মেলেনি শাওন ও রাজুর।

২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল ঢাকার কোর্ট-কাচারি এলাকা থেকে ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ সেন্টুকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার স্ত্রী লাভলী আক্তার বলেন, একটি মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে এক আইনজীবীর কাছে যান। সেখান থেকে বের হওয়ার পরপরই কয়েকজন যুবক তার স্বামীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এখনও তার খোঁজ মেলেনি। রহমত উল্লাহ সেন্টুর বাসা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও শাহীনবাগ থেকে বিএনপির নেতাসহ আটজনকে র‌্যাব পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো হদিস নেই। নিখোঁজ আটজন হলেন : ঢাকার সাবেক ৩৮ নম্বর (২৫) ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, তার খালাতো ভাই জাহিদুল কবির তানভীর, মুগদার আসাদুজ্জামান রানা, উত্তর বাড্ডার আল আমিন, নাখালপাড়ার মাজহারুল ইসলাম রাসেল, শাহীনবাগের আবদুল কাদের ভূঁইয়া, কায়সার আহমেদ ও আদনান চৌধুরী। তাদের মধ্যে আদনান ও কাওসারকে শাহীনবাগের বাসা থেকে এবং অন্যদের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের ছোট বোন সানজিদা ইসলাম বলেন, তার ভাইসহ আটজন নিখোঁজের ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দফতর, র‌্যাব সদর দফতর, র‌্যাব-১ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে লিখিত আবেদন করেও কোনো সুফল পাননি। ৯ মার্চ হাইকোর্টে রিট মামলা করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাজেদুল ইসলাম সুমনকে র‌্যাবের কালো পোশাক পরিহিত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক আটক/অপহরণ/গুম করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

সুমনের মা হাজেরা খাতুনের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানির পর ১০ মার্চ বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে সুমনকে দু’বছর ধরে আটক রাখাকে কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়।



মন্তব্য চালু নেই