মানব হৃদয়ে ‘মৃত্যুচিন্তা’

সাফাত জামিল শুভ | প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ উপন্যাসে লিখেছেন, “আমরা জানি একদিন আমরা মরে যাব, এই জন্যেই পৃথিবীটাকে এত সুন্দর লাগে।যদি জানতাম আমাদের মৃত্যু নেই তাহলে পৃথিবীটা কখনোই এত সুন্দর লাগতো না।”
পৃথিবীর বিখ্যাত লেখকগণ মৃত্যু নিয়ে অসংখ্য উক্তি,কবিতা লিখেছেন, কেউবা উপন্যাসের সমাপ্তি টেনেছেন করুণ মৃত্যুকাহিনী দিয়ে।

জীবন হচ্ছে স্মৃতির সমষ্টি। একজন পাগল, যে রাস্তায় ঘুমায়, কোনো হোটেলের সামনে বসে থাকে, প্রতিদিন পথচারীদের বিরক্ত করে, তার মৃত্যুতে বস্তুত “মৃত্যু” হয় কার? সে মরে গেলো কারো তো কিছু যায় আসে না। কিন্তু তার আশেপাশের মানুষগুলো প্রতিনিয়ত তার মৃত্যু অনুভব করে। এভাবে স্মৃতির মৃত্যু হতে থাকে প্রতিনিয়ত। অর্থাৎ মৃত্যু শুধু শারীরিক অনুপস্থিতি নয়, এটি হল নিকটজনদের আমাদেরকে ঘিরে হাজারো স্মৃতির সমাপ্তি।

মৃত্যু চিন্তা খুব অদ্ভুত একটা চিন্তা। যখনি মৃত্যুর চিন্তা মাথায় আসে প্রবল এক ঘোরের মধ্যে চলে যাই আমি। জগতটাকে খুব বেশি রহস্যময় মনে হয় তখন।
সবাই থাকবে যে যার মত, শুধু আমিই থাকবনা। আমার শূন্যতা হয়ত কিছুটা প্রভাব ফেলবে আমার কাছের মানুষগুলোর মনে, হয়ত তারা কয়েকদিন আমাকে নিয়ে ভাববে। কিছুদিন পর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাবে আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব।

গত রাতে একটা বিশেষ ঘটনার কারণে সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। প্রচণ্ড অশান্তিতে কেটেছে পুরোটা রাত। শেষ রাতের দিকে হুট করে মাথায় মৃত্যু চিন্তা এসে ভর করল। মুহূর্তেই সমস্ত অশান্তি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। অন্য এক অনুভূতি গ্রাস করে নিল আমার সমস্ত অস্তিত্ব। এই অনুভূতি অন্য কোন জগতের। এই জগতের কোন অনুভূতির সাথেই মিল নেই এর। মৃত্যুর পর সামাজিক রীতি অনুযায়ী কবর দেয়া হবে দেহটাকে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পড়ে থাকবে প্রাণহীন দেহটা। বায়োলজিক্যাল সিস্টেম অনুযায়ী প্রত্যেকটা মাংসপিণ্ড মিশে যাবে মাটির সাথে, কিছুদিন শুধুমাত্র আমার কংকালটাই শুয়ে থাকবে খালি মাটিতে। একসময় সেটাও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকবেনা আমাদের। সমস্ত সম্মান, ক্ষমতা, চেহারার মাধুর্য মিশে যাবে মাটির সাথে। রাস্তার কুকুর থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত সবাইকে একই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যেতে হবে। পার্থিব কোন ক্ষমতাই আমার এটি ঠেকাতে পারবেনা। কোন কিছুই বন্ধ করতে পারবেনা প্রকৃতির এই অদ্ভুত চক্র।

আমরা অনেকেই ছোটবেলায় ইংরেজ কবি জন ডানের মৃত্যু নিয়ে একটি কবিতা পড়েছিলাম- ‘ডেথ, বি নট প্রাউড’। কবিতার শেষ দুটি লাইন ছিল এমন- ‘একটা ছোট্ট ঘুমের পর যখন আমরা চিরকালের জন্য জাগবো/ মৃত্যু, তুমি তখন থাকবে না; তোমারই তখন মৃত্যু হবে।’ কবিতাটি আমাদের অনেকের মনেই বেশ গভীর চিহ্ন রেখে গিয়েছিল। কৈশোর থেকে তারুণ্যে বেড়ে ওঠার জোয়ারে এবং জীবনের চাঞ্চল্যে ডুব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোটবেলার এই কবিতা অনেকেরই মনে থাকেনি। তখন আমরা জীবন-পাগল বা জীবন-উদাসী তরুণ কবিতা দিয়ে মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরের কথা, মৃত্যুর কথাই মনে আসে না। তবে সবাই যে মৃত্যুকে ভুলে থাকতাম তা নয়। চোখের সামনে মৃত্যু দেখলে মনে না এসে, মৃত্যুর কথা না ভেবে উপায় নেই। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য যাকে ইচ্ছা করলেও দূরে রাখার সামর্থ্য আমাদের নেই। চোখের সামনে আরেকজনের মৃত্যু দেখতে হয়, নিজেকে মৃত্যুর গহ্বরে সঁপে দিতে হয়। মৃত্যু আসেই, মৃত্যুর মতো, ধেয়ে। কখনও ধেয়ে, কখনও জীর্ণতার কাঁধে ভর করে, কখনও নীরবে, কখনও পতাকা উড়িয়ে, কখনও প্রচার করে, কখনও অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে, কখনও নিজের কাছ থেকে পালাতে গিয়ে আবার কখনও মৃত্যুর কাছ থেকে পালাতে গিয়েও মৃত্যু আসেই।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে লিখেছেন- ‘আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশু বয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়- কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই।”

জালালউদ্দিন রুমি’র সেই কথাটা আবারও বলি, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, কিন্তু খুব অল্প কয়েকজনই জীবনের স্বাদ পাবে।যখন তুমি শেষবার নৈঃশব্দে ডুববে, তোমার শব্দ ও আত্মা পৌঁছে যাবে এমন এক পৃথিবীতে যেখানে কোন স্থান নেই, সময় বলে কিছু নেই!”

পরিশেষে পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরঅানের আয়াত দিয়ে লেখনীর ইতি টানছি। কুরঅানুল কারীমে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।’ [সুরা আন নিসা : আয়াত- ৭৮]

মহান আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দিন। আমীন।।



মন্তব্য চালু নেই